ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:৩০:২৬ AM

মেরুল বাড্ডায় ৩০০ কোটি টাকার জমি বেদখল

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
05-10-2026 09:22:25 PM
মেরুল বাড্ডায় ৩০০ কোটি টাকার জমি বেদখল

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় মূল সড়ক ঘেঁষে প্রায় ১১ একর জমি। বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। জমিটির মালিকানা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে। অথচ গত ২১ বছর ধরে জমিটি কার্যত দখলে রেখেছে একটি প্রভাবশালী চক্র। এ সময়ে জমিতে গড়ে উঠেছে কাঁচাবাজার, মাছ-মুরগির আড়ত, বাঁশের ব্যবসা ও বস্তি। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জমি উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি রাজউক।

জমি দখল ধরে রাখতে বিভিন্ন সময়ে রাজউকের বিরুদ্ধে পাঁচটি রিট মামলা করা হয়েছে। তবে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি কিংবা জমি উদ্ধারে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজউকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সংস্থাটির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিষ্ক্রিয়তা বা যোগসাজশের কারণেই বছরের পর বছর বিষয়টি ঝুলে আছে।

নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাড্ডা মৌজায় ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এলএ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২-এর আদেশ অনুযায়ী একই বছরের ২৫ এপ্রিল জমিটি ডিআইটির কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তৎকালীন টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-এর ৯৩-এ ধারার অধীনে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং ডিআইটির অনুকূলে দখল হস্তান্তর সনদও দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজউক করা হয়।

এরপরও জমিটির দখল নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। ২০০৫ সালে দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী ৫৬১০ নম্বর রিট মামলা করেন। একই বছর রাজউকের তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলে অভিযান বন্ধের দাবিতে হাইকোর্টে আরেকটি রিট হয়। পরে ২০০৭ সালে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির পক্ষ থেকেও ২১৪১ নম্বর রিট করা হয়। এভাবে ধাপে ধাপে পাঁচটি রিট মামলা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে রাজউকের জমি ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় ধরনের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। সরেজমিনে দেখা গেছে, মূল সড়কের পাশে বাঁশের আড়ত, মাছ ও মুরগির পাইকারি বাজার এবং অস্থায়ী দোকান রয়েছে। ভোরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ, মুরগি ও বাঁশবোঝাই ট্রাক এসে সেখানে ভিড় করে। সকাল হলেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে একটি বড় বস্তি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জমিতে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে দোকান বসানোর বিনিময়ে নিয়মিত স্পটভাড়া আদায় করা হয়। এ খাত থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অর্থের হিসাব বা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’কে ঘিরে। স্থায়ী দোকান দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রায় ছয় হাজার মানুষের কাছ থেকে দীর্ঘ সময়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। সদস্যদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে চাঁদা, কিস্তি, মামলা খরচসহ নানা অজুহাতে অর্থ নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

সমিতির নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ৮ মার্চ সদস্যদের কাছ থেকে মামলা ও অন্যান্য খরচ বাবদ এক হাজার টাকা করে নেওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। মৃত বা অন্যত্র চলে যাওয়া সদস্যদের সদস্যপদ হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও অর্থ নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল। এভাবে বছরের পর বছর সদস্যদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে রাজউক জানিয়েছে, মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির নামে কোনো জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। অথচ জমির পাশে সমিতির নামে সাইনবোর্ড রয়েছে এবং সেখানে জমির মালিকানা ও আমমোক্তার সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে জমিটির মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সমিতির সদস্যদের অভিযোগ, স্থায়ী দোকানের আশায় অনেকে সঞ্চয় ভেঙে, কেউ জমি বিক্রি করে, আবার কেউ ঋণ নিয়ে সমিতিতে টাকা জমা দিয়েছেন। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও দোকান পাননি তারা। সদস্যদের কেউ কেউ দাবি করছেন, তাঁদের জমা দেওয়া অর্থেরও কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই।

সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহীন বলেন, ১৯৮৮ সালে সমিতির যাত্রা শুরু হয় এবং একসময় সদস্য সংখ্যা ছয় হাজারের বেশি ছিল। দীর্ঘদিন চাঁদা দেওয়ার পরও সদস্যদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। তাঁর দাবি, সমিতির ভেতরে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের কারণে গত কয়েক বছর ধরে কার্যক্রম কার্যত স্থবির।

সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, নিজের একটি দোকানের আশায় তিনি দীর্ঘদিন টাকা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রায় ১৬ বছর পার হলেও দোকান পাননি এবং সদস্যদের বিপুল অর্থেরও কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি সমিতিতে টাকা দিয়েছেন। দোকান পাওয়ার আশা না থাকায় কিস্তি দেওয়া বন্ধ করেছেন, কিন্তু জমা অর্থের কী হয়েছে তা জানেন না।

রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, রাজউকের বিরুদ্ধে অনেক রিট মামলা রয়েছে এবং মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংস্থার কিছু কর্মকর্তা কাজ করতে অনীহা দেখান।

মেরুল বাড্ডার ১১ একর জমির ঘটনা তাই শুধু একটি জমি দখলের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা, রাজউকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, বিপুল অর্থের লেনদেন এবং হাজার হাজার সাধারণ ব্যবসায়ীর প্রত্যাশা ও আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ্যে এনে দ্রুত আইনি নিষ্পত্তি করা এবং সমিতির আর্থিক লেনদেনের নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জমিটি কারা কীভাবে ব্যবহার করছে এবং এর মাধ্যমে কারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে—সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।