ঢাকা, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:২৬:০৯ AM

নোয়াখালী পাসপোর্ট অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
16-10-2026 12:43:49 PM
নোয়াখালী পাসপোর্ট অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য

নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি এবং সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে, পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার একাধিক মামলার আসামি ও পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার অভিযোগ। এসব অনিয়মের সঙ্গে অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বাইরের মধ্যস্থতাকারীদের যোগসাজশ রয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী। তাঁদের অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে উপপরিচালক (ডিডি) মেহেদী হাসান ও উপসহকারী পরিচালক মো. নাজমুল আহসান হাবিবের ভূমিকা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আবেদন জমা, তথ্য সংশোধন, পুলিশি যাচাই এবং পাসপোর্ট সংগ্রহের বিভিন্ন পর্যায়ে দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিতে চাপের মুখে পড়তে হয়। সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে সরকারি ফির বাইরে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নাম, বয়স কিংবা অন্যান্য তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, নোয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনের সড়কের পাশে বেশ কয়েকটি কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব দোকানের কোনো কোনোটি আবেদন পূরণ ও কাগজপত্র প্রস্তুতের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও কাজ করে। আবেদনকারীদের কয়েকজনের দাবি, দালালের মাধ্যমে গেলে আবেদন জমা দেওয়া সহজ হয়; কিন্তু সরাসরি সেবা নিতে গেলে নানা ভুলত্রুটি দেখিয়ে আবেদন ফেরত দেওয়া কিংবা হয়রানির শিকার হতে হয়।

সোনাইমুড়ী থেকে আসা কবির হোসেন জানান, পাসপোর্ট অফিসের সামনের একটি কম্পিউটারের দোকানের মাধ্যমে আবেদন করতে তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, আবেদনপত্রে নাম, পিতার নাম কিংবা বয়সের মতো তথ্যে ভুল থাকলে তা সংশোধনের জন্য বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়।

রহমত আলী নামের আরেক সেবাপ্রার্থী বলেন, “আমি এর আগে দুইবার নিজেই আবেদন নিয়ে গেলে আমার আবেদনটি ফেরত দেওয়া হয়। আজ দালালের মাধ্যমে ২৮০০ টাকা কন্ট্রাক করে কোনো ঝামেলা ছাড়াই আবেদন জমা দিয়ে আসলাম।”

সেনবাগ থেকে আসা কলেজশিক্ষার্থী সবুজ জানান, জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট প্রয়োজন হওয়ায় তিনি এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ১৬ হাজার টাকার চুক্তিতে আবেদন জমা দিয়েছেন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, আগে পাসপোর্ট অফিসে হয়রানির কথা শুনলেও এবার নিজেই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ থেকে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহকের দাবি, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরে চেষ্টা করেও পাসপোর্ট করতে না পেরে নোয়াখালীতে এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পাঁচ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিয়ে আবেদন জমা দিয়েছেন। একইভাবে কুমিল্লার লাকসাম থেকে আসা ছদ্মনাম ‘কাশেম’ জানান, নিজ জেলার পাসপোর্ট অফিসে কয়েক দিন চেষ্টা করেও কাজ না হওয়ায় নোয়াখালীতে এসে সাড়ে চার হাজার টাকা অতিরিক্ত দেওয়ার পর আবেদন জমা দিতে পেরেছেন।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থেকে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ব্যক্তি নিজের বিরুদ্ধে দুটি মাদক মামলার কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, জামিনে থাকা অবস্থায় পাসপোর্টের আবেদন করতে তিনি মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা নিয়েছেন এবং অতিরিক্ত নয় হাজার টাকা দিয়েছেন। তবে এসব ব্যক্তির বক্তব্য ও অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। মামলা থাকা বা জামিনে থাকা মাত্রই কোনো ব্যক্তি আইনগতভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তও সংশ্লিষ্ট বিধি ও ব্যক্তির পরিস্থিতি যাচাই ছাড়া দেওয়া যায় না।

কোম্পানীগঞ্জ থেকে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে আবেদন পাঠানোর সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তাঁর দাবি, সাধারণ ও জরুরি পাসপোর্টের জন্য আলাদা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয় এবং এর একটি অংশ অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে এ অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় কয়েকজন আবেদনকারী ও ব্যবসায়ীর বক্তব্যে সোনাইমুড়ী, মাইজদী ও বেগমগঞ্জ এলাকার কয়েকটি কম্পিউটার ও স্টুডিও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। সোনাইমুড়ীর খাদ্যগুদামের বিপরীতে বদরুদ্দোজা মার্কেটে অবস্থিত সুফিয়া এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে আবেদন ও পরামর্শ দেওয়ার আড়ালে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

পাসপোর্ট অফিসসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীসহ বিভিন্ন জেলার কিছু আবেদনকারীকে নোয়াখালী অফিসের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আবেদন করতে সহায়তা করা হয়। জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন এবং পাসপোর্ট আবেদনে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। সূত্রটির আরও দাবি, প্রতিদিন জমা পড়া আবেদনের বড় অংশ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আসে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথিপত্র, আবেদনপ্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপসহকারী পরিচালক মো. নাজমুল আহসান হাবিব বলেন, তাঁর বা তাঁর কর্মরত অফিসের বিরুদ্ধে আনা অনিয়মের অভিযোগ মিথ্যা। তিনি বলেন, “আমি এখানে ছোট অফিসার। আমার ওপরে আমার বড় অফিসার উপপরিচালক মেহেদী হাসান স্যার আছেন। তিনি যেভাবে বলেন, ঠিক সেভাবে আমরা কার্যক্রম চালিয়ে যাই।” এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য তিনি উপপরিচালক মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে, উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, তিনি ওই অফিসে নতুন যোগ দিয়েছেন। উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পর্কে তাঁকে জানানো হলে তিনি বলেন, “আমি দ্রুত এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ দাপ্তরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

সেবাপ্রত্যাশীরা পাসপোর্ট অফিসের সামনে দালালদের অবাধ বিচরণ বন্ধ, সরকারি ফি ও সেবার সময়সীমা প্রকাশ্যে প্রদর্শন, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সরকারি সেবা পেতে কোনো মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সরাসরি আবেদন ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।