ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:০৭:২৬ AM

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে পদায়ন নিয়ে বিতর্ক

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
12-10-2026 07:33:50 PM
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে পদায়ন নিয়ে বিতর্ক

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মনজুরুল আলম শরীফের পদায়নকে কেন্দ্র করে অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে আলোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অতীতে একই সার্কেলে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকার সময় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ তদন্ত ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় ২০২৪ সালে তাঁকে মামলাটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপরও পুরোনো কর্মস্থলে তাঁর পুনরায় পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টদের একাংশ।

গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাঁকে চাঁদপুর জেলা থেকে ঢাকা মেট্রো সার্কেলে বদলি করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সার্কেলে তাঁর পদায়ন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বদলি নীতিমালা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ।

প্রকল্পের বিল নিয়ে অভিযোগ, হয় বিভাগীয় মামলা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কয়েকটি নির্মাণ প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের অতিরিক্ত ও অগ্রিম বিল প্রদানের অভিযোগ ওঠে মনজুরুল আলম শরীফের বিরুদ্ধে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় আইডিয়াল কলেজের আটতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ‘শফিক এন্টারপ্রাইজ’কে ৯৩ লাখ টাকা এবং মোহাম্মদপুরের নূরজাহান বালিকা বিদ্যালয়ের ছয়তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পে একই প্রতিষ্ঠানকে দেড় কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া মিরপুরের সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের খেলার মাঠ ও রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে ‘অনিতা এন্টারপ্রাইজ’কে ১৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়ার অভিযোগও ছিল।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তবে তদন্ত, ব্যক্তিগত শুনানি ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার পর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব সোলেমান খানের স্বাক্ষরিত আদেশে মনজুরুল আলম শরীফসহ চারজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

পুরোনো কর্মস্থলে ফেরায় প্রশ্ন
বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর একই সার্কেলে তাঁর পুনরায় পদায়ন নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাঁদের বক্তব্য, অতীতে যেসব প্রকল্পের বিল নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল, সেই কর্মস্থলে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বিবেচনা ও স্বচ্ছতার বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

এদিকে চাঁদপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে টেন্ডার-বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্যও এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন—এমন আলোচনাও রয়েছে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে। তবে এ ধরনের বক্তব্যের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগ ও যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

অভিযোগ অস্বীকার নির্বাহী প্রকৌশলীর
বিভাগীয় মামলা, অতীতের অভিযোগ ও বর্তমান পদায়ন নিয়ে বক্তব্য জানতে মনজুরুল আলম শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, একই সংবেদনশীল কর্মস্থলে তাঁকে পুনরায় পদায়নের কারণ জানতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্বে) মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘিরেও বিতর্ক
উল্লেখ্য, সম্প্রতি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীর নিজ কার্যালয়ে নগদ অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। ভিডিওটি পুরোনো বলে জানা গেলেও সেটি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে ওই কর্মকর্তাকে সিলেট সার্কেলে বদলি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নতুন নির্বাহী প্রকৌশলীর পদায়ন নিয়ে ওঠা প্রশ্ন অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টিকে আবারও আলোচনায় এনেছে।

তবে মনজুরুল আলম শরীফের বিরুদ্ধে অতীতের অভিযোগগুলো বিভাগীয় মামলায় প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান পদায়নের ক্ষেত্রে কী কী প্রশাসনিক বিবেচনা অনুসরণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে অধিদপ্তরের স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকলে বিতর্ক নিরসনে সহায়ক হতে পারে। অভিযোগ, তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টির স্বচ্ছ পর্যালোচনাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।