ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:২৫:২৯ AM

সাত গুমের প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি টাকার কাজ

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
21-10-2026 08:30:30 PM
সাত গুমের প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি টাকার কাজ

সুমনসহ সাতজনকে গুমের ঘটনায় কিসমৎ হায়াতের সম্পৃক্ততার তথ্য গুম কমিশনের প্রতিবেদনে; গত এক বছরে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ঝুলিতে ডিএনসিসির একাধিক ঠিকাদারি কাজ

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ সাতজনকে গুমের ঘটনায় সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিলেন র‍্যাবের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কিসমৎ হায়াৎ। তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংকে গত এক বছরে প্রায় তিন কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। প্রতিষ্ঠানটির পাওয়া এসব কাজের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে গুলশান-২ এলাকার ট্রাফিক সিগন্যাল সংস্কার ও পরিচালনার কাজও রয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ আগস্ট গুলশান-২ এলাকার ট্রাফিক সিগন্যাল সংস্কার ও পরিচালনার জন্য ৬২ লাখ টাকার কাজ পায় কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং। এক বছর মেয়াদি এই কাজের সময়সীমা চলতি বছরের ২৭ আগস্ট থেকে ২০২৭ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শেয়ারহোল্ডার ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিসমৎ হায়াৎ, যিনি একসময় র‍্যাব-১-এর পরিচালক ছিলেন।

এর আগে গত ১ জুন ডিএনসিসির ট্রাফিক প্রকৌশল বিভাগের ২ কোটি ৪ লাখ টাকার আরেকটি কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ৩৯ লাখ টাকার একটি কাজও পেয়েছিল তারা, যা পরবর্তী সময়েও চলমান ছিল। সব মিলিয়ে উল্লেখিত কাজগুলোর আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গুম হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন। একই দিনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীসহ মোট সাতজন নিখোঁজ হন। তাঁদের গুমের ঘটনায় র‍্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘মায়ের ডাক’ নামের সংগঠন। স্বজনদের সন্ধান ও ঘটনার বিচার চেয়ে বছরের পর বছর আন্দোলন করেছেন সংগঠনটির সদস্যরা। তবে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা তাঁদের স্বজনদের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুমসংক্রান্ত তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসে। গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ২০১২-১৩ সালে বিএনপি, ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের গুম ও হত্যার ঘটনায় কিসমৎ হায়াতের নাম উঠে আসে। এসব ঘটনার ভুক্তভোগীদের মধ্যে সুমনও রয়েছেন।

কমিশনে দেওয়া লিখিত সাক্ষ্যে কিসমৎ হায়াৎ গুমের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল হাসানের নির্দেশে তাঁকে এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন।

এদিকে গুমের ঘটনায় অভিযোগের মুখে থাকা সাবেক এই কর্মকর্তার প্রতিষ্ঠানের সরকারি কাজ পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি সংস্থার ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়েছিল কি না, তা নিয়ে স্বচ্ছতা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কিসমৎ হায়াতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্রের দাবি, সাবেক এই র‍্যাব কর্মকর্তা বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। তবে তাঁর বিদেশে অবস্থানের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, সিটি করপোরেশনের দরপত্রের কার্যক্রম ই-জিপির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তিনি বলেন, ‘এখানে যারা এসএলটিতে ও টিডিএসে এগিয়ে থাকেন, তাঁরা কাজ পান। কোনো ধরনের ম্যানিপুলেশনের সুযোগ থাকে না। ট্রাফিক ও বর্জ্যের কাজও একই প্রক্রিয়ায় হয়েছে।’

কিসমৎ হায়াতের প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক বলেন, ‘র‍্যাব কর্মকর্তার প্রতিষ্ঠানের কাজ প্রসঙ্গে আমার জানা ছিল না।’

গুমের অভিযোগে তদন্তাধীন একজন সাবেক কর্মকর্তার প্রতিষ্ঠানের সরকারি কাজ পাওয়া এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।