ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:০৮:৫৭ AM

৭০ কোটি টাকার বাণিজ্য,যারা জড়িত

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
14-10-2026 08:22:16 PM
৭০ কোটি টাকার বাণিজ্য,যারা জড়িত

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা’ পদে নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ব্যাপক নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২৪২টি পদের বিপরীতে অন্তত ৭০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে বলে দাবি করেছে শীর্ষনিউজ ডটকম ও সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১০ অক্টোবর বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে নিয়োগ পরীক্ষাটি স্থগিত করা হয়। এ ঘটনায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পাশাপাশি সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটে।

২৪২ পদের বিপরীতে ৭০ কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে প্রার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী বা দালালদের মাধ্যমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অঙ্ক ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থের অবৈধ লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪২টি পদের বিপরীতে অন্তত ৭০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন যাচাই, আর্থিক নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের বিকল্প নেই।

এদিকে, সারাদেশ থেকে প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন। রাজধানীর ৯৫টি কেন্দ্রে পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ মাইকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয়।

পরে একই দিন জানানো হয়, স্থগিত পরীক্ষা আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে। তবে পরীক্ষা স্থগিতের পরও নিয়োগ কমিটির সদস্যদের পরিবর্তন না করায় প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আগেই একই কমিটির অধীনে পরীক্ষা আয়োজন কতটা যুক্তিসংগত।

নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেদ করে প্রশ্ন বাইরে গেল কীভাবে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ অক্টোবরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র রাজধানীর দিলকুশায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তৈরি ও ছাপানো হয়েছিল। এ কাজে নিয়োগ কমিটির পাঁচ সদস্য এবং ওএমআরডিএম নামের ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের ২০ জন কর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।

কক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, মোবাইল বাজেয়াপ্তকরণ এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরও প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে নিয়োগ কমিটির সভাপতি ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডি এম আতিকুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অন্যদের জন্য বিধিনিষেধ থাকলেও তাঁর হাতে মোবাইল ফোন দেখা গেছে এবং তিনি একাধিকবার প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপানোর কক্ষে প্রবেশ করেছেন। এ কারণে তাঁকে ঘিরে প্রশ্ন উঠলেও অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য এবং তদন্তে পাওয়া প্রমাণ প্রকাশ করা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

নতুন পরীক্ষার প্রস্তুতি, পুরোনো কমিটি বহাল
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, এবার সরাসরি প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরিবর্তে খাতা বা রোল নম্বর পরিবর্তনসহ অন্য কোনো পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপানোর স্থান পরিবর্তন করে সচিবালয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরীক্ষার আগের রাতে সেখানে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত ও ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। স্থান পরিবর্তন করা হলেও নিয়োগ কমিটির সদস্যদের অপরিবর্তিত রাখায় পরীক্ষার নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. কবির খাঁনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে তাঁদের সঙ্গে ডি এম আতিকুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার দাবি করা হলেও এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত জমা পড়েনি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এ অবস্থায় চাকরিপ্রার্থীদের প্রধান দাবি হলো—অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বচ্ছ পরিবেশে পরীক্ষা আয়োজন। নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে তদন্তের ফল প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ এবং অনিয়মের অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি জরুরি। অন্যথায় লাখো চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ ও সরকারি নিয়োগব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।