বরিশাল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাকেরগঞ্জের নাম। বর্তমানে বাকেরগঞ্জ বরিশাল জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হলেও একসময় বৃহত্তর এই অঞ্চলের প্রশাসনিক পরিচিতি ছিল বাকেরগঞ্জ জেলা নামে। সময়ের পরিক্রমায় প্রশাসনিক কাঠামো ও সদর দপ্তরের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাকেরগঞ্জের পরিবর্তে বরিশাল নামটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তবে এই পরিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই।
ঐতিহাসিকভাবে বাকেরগঞ্জ নামটি এ অঞ্চলের পরিচিতি, প্রশাসনিক বিকাশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, আঠারো শতকের শেষভাগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে এ অঞ্চলের প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে। আগা বাকের খানের নামের সঙ্গে বাকেরগঞ্জ নামটির সম্পর্ক রয়েছে বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ করা হয়। ১৭৯৭ সালে বাকেরগঞ্জ জেলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ অঞ্চলের প্রশাসনিক পরিচিতি আরও সুসংহত হয়।
পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে জেলা সদরের অবস্থান পরিবর্তন করা হয়। ১৮০১ সালে জেলা সদর বাকেরগঞ্জ থেকে বরিশালের গিরদে বন্দরে স্থানান্তরিত হয় বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে বরিশাল শহরের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। নদীবিধৌত এই অঞ্চলে নৌপথে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ থাকায় বরিশাল ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে গড়ে ওঠে।
জেলা সদরের নাম ও অবস্থানের পরিবর্তন হলেও দীর্ঘদিন বাকেরগঞ্জ নামটি প্রশাসনিক পরিচিতির অংশ হিসেবে টিকে ছিল। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে বাকেরগঞ্জ নামটি যুক্ত থাকায় এটি স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের অতীত প্রশাসন, জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক বিকাশের নানা স্মৃতি।
পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ধারাবাহিকতায় বরিশাল নামটি জেলা ও বৃহত্তর অঞ্চলের পরিচিতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৯৩ সালে বরিশাল বিভাগ গঠনের পর বরিশালের প্রশাসনিক পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়। বর্তমানে বরিশাল জেলা ও বরিশাল বিভাগ পৃথক প্রশাসনিক একক হিসেবে পরিচিত। তবে জেলার নাম পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট সময় ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের তথ্য নির্ভরযোগ্য নথির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বর্তমানে বাকেরগঞ্জ বরিশাল জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী উপজেলা। নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, জনপদ ও সামাজিক ঐতিহ্যের কারণে এই উপজেলার রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। কিন্তু অনেকের কাছে বাকেরগঞ্জের অতীত প্রশাসনিক গুরুত্ব এবং বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক অজানা রয়ে গেছে।
ইতিহাসের এই অধ্যায় নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি। কারণ, কোনো এলাকার নাম কেবল প্রশাসনিক পরিচয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্মৃতি, ঐতিহ্য ও অতীতের ধারাবাহিকতা। বাকেরগঞ্জ থেকে বরিশালের পরিচিতি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে সরকারি নথি, পুরোনো মানচিত্র ও ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে এ ইতিহাস আরও তথ্যসমৃদ্ধভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।