ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৩:৫৭:৫৮ AM

সিটি সেন্টার নিয়ে বিরোধ, বিপাকে ডেভেলপার

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
19-10-2026 08:19:22 PM
সিটি সেন্টার নিয়ে বিরোধ, বিপাকে ডেভেলপার

রাজধানীর মিরপুর সিটি সেন্টার দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পাঁচ ভূমিমালিকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সালে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের নামে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরও তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তাঁরা। অন্যদিকে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ১৭ তলা বাণিজ্যিক ভবনটি নির্মাণ করা ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এজি প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ভবনটির বিপরীতে দুটি ব্যাংক থেকে নেওয়া প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ নিয়ে তারা চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে।

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে ৩০ কাঠা জমির ওপর তিনটি বেজমেন্টসহ ১৭ তলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়। জমির মালিক হায়দার আলী খান বহলুলসহ চারজনের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে চুক্তি করে এজি প্রপার্টিজ। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন নিয়ে ২০১৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে কাজ শুরুর পর এজি প্রপার্টিজ জানতে পারে, জমির মালিকেরা অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসেট ডেভেলপমেন্ট নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও চুক্তি করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এজি প্রপার্টিজের সঙ্গে চুক্তির সময় বিষয়টি গোপন রাখা হয়। অনুসন্ধানে আরও তিনটি পক্ষের সঙ্গে জমির মালিকদের চুক্তির তথ্য উঠে এসেছে। একাধিক পক্ষের মামলা ও আদালতের নিষেধাজ্ঞায় নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি।

করোনা মহামারির মধ্যেও ২০২০ ও ২০২১ সালে নির্মাণকাজ চালিয়ে যায় এজি প্রপার্টিজ। ভবনটির কাজ এগিয়ে নিতে দুটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। ২০২১ সালে নির্মাণকাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ হলে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়।

এজি প্রপার্টিজের অভিযোগ, হায়দার আলী খান বহলুল, শওকত আলী খান বিপুলসহ পাঁচ ভূমিমালিক আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র দল নিয়ে ভবনটিতে প্রবেশ করেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রকৌশলীদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয়। পরে ভবনটিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় স্থাপন করে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান ভবনটি দখল এবং এর পরবর্তী সময়ে তাঁদের ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরেন। এদিকে, অনুসন্ধানে হায়দার আলী খানের রাজনৈতিক প্রভাবের উৎস হিসেবে তাঁর শ্বশুর মনির চৌধুরীর নাম উঠে এসেছে। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাদারীপুর জেলা শাখার সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এবং মাদারীপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান।

মনির চৌধুরীর চাচাতো ভাই আওয়ামী লীগের সাবেক চিফ হুইপ নূরে আলম লিটন চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এজি প্রপার্টিজের আমমোক্তারনামা বাতিল করাতে ভূমিকা রাখেন তিনি। এ কাজে মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার নুরুল আমিন সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এজি প্রপার্টিজের উপমহাব্যবস্থাপক হাবিবুল হাসানের অভিযোগ, আমমোক্তারনামা বাতিলের পাশাপাশি তাঁদের কাছে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাপের মুখে প্রতিষ্ঠানটি এক কোটি ২৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে আমমোক্তারনামা বাতিল হলেও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি উপেক্ষা করে জমির মালিকেরা ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি এজি প্রপার্টিজ। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, পাঁচ ভূমিমালিক এখনো ভবনটির ওপর প্রভাব বিস্তার করছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অংশে থাকা দোকান ও বাণিজ্যিক স্পেসের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকেও ভূমিমালিকপক্ষের লোকজন জোরপূর্বক ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করছেন। এতে ভাড়াটিয়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চুক্তিতে যা উল্লেখ থাকে, তা মেনে চলতে হবে। কেউ প্রভাবশালী হলেও চুক্তির বাইরে গিয়ে অন্য পক্ষকে উচ্ছেদ করতে পারেন না। মিরপুর সিটি সেন্টারের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথাও জানান তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে বেআইনি বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, জমির মালিকানা থাকলেই চুক্তি উপেক্ষা করে যেকোনো সময় ডেভেলপারকে সরিয়ে দেওয়া যায় না। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান চুক্তির ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করে।

ভবন দখল, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও আমমোক্তারনামা বাতিলের অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে না পাওয়ায় ঋণের বোঝা ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তায় পড়েছে এজি প্রপার্টিজ। একই সঙ্গে ভবনটিতে দোকান ও বাণিজ্যিক স্পেস কেনা ব্যক্তিরাও তাঁদের বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। ভবনটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ সুরক্ষা ও সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ক্রেতা ও ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।