ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৪:২৬ AM

গাছ রোপণে অনিয়ম, কাঠগড়ায় মোয়াজ্জেম

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
29-09-2026 07:32:16 PM
গাছ রোপণে অনিয়ম, কাঠগড়ায় মোয়াজ্জেম

গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরবরিকালচার (বৃক্ষপালন) শাখার উপ-বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ব্যাপক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নতুন ভবনের আঙ্গিনায় কোনো প্রকার গাছ না লাগিয়েই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

ভুয়া বিলে কোটি টাকা লোপাট ও সিন্ডিকেট
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মো. মোয়াজ্জেম হোসেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নবনির্মিত ভবনের আঙ্গিনায় বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে মারাত্মক অনিয়ম করেছেন। বাস্তবে প্রকল্প এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোনো গাছ রোপণ না করেই ভুয়া কাগজপত্র ও বিলে স্বাক্ষর করে কোটি কোটি টাকা তুলে নেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় নামে-মাত্র বৃক্ষরোপণ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের ধারাবাহিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

রাজনৈতিক সুপারিশ ও প্রভাবশালী ছত্রছায়া
অভিযোগে বলা হয়, বিগত সরকারের সময়ে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সুপারিশকৃত ডিও লেটার ব্যবহার করে মোয়াজ্জেম হোসেন গণপূর্তের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বিশ্বনাথ সরকার বিটু এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিমের লিখিত সুপারিশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও রাষ্ট্রীয় সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। অভিযোগকারীদের দাবি, ছাত্রলীগের প্রভাব খাটিয়ে গণপূর্তে অনিয়ম ও লুটপাটের একটি বড় সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন মোয়াজ্জেম। এমনকি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বহাল তবিয়তে নতুন সিন্ডিকেট তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ অব্যাহত রাখেন।

জালভোট ও পুরোনো তদন্ত ধামাচাপা
অভিযোগপত্রে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দী) আসনে তৎকালীন সংসদ সদস্য প্রয়াত আব্দুল মান্নানের পক্ষে জালভোট প্রদানে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে আব্দুল মান্নানের লিখিত সুপারিশের কপি অভিযোগপত্রে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে চাকরিতে অসদাচরণ, অর্থঋণ আদালতের মামলা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের কারণে ইতিপূর্বেও তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছিল। নথির স্মারক নম্বর ৫৮৭১ (৫ মার্চ ২০০৯), ৭৯০ (১১ মার্চ ২০১২) এবং ১৮৯২ (২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১)-এর তথ্যানুযায়ী, একাধিকবার তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও তদন্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও রাজনৈতিক খুঁটির জোরে সেগুলো ধামাচাপা পড়ে থাকে। ঢাকায় নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের (মানিলন্ডারিং) অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপ-বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, "গণপূর্তের বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য আমাদের নজরে এসেছে। ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। কমিশন আইন ও বিধি অনুযায়ী অভিযোগের তথ্যাদি যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"

আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "বৃক্ষরোপণের মতো পরিবেশবান্ধব সরকারি প্রকল্পে গাছ না লাগিয়ে ভুয়া বিল বানিয়ে টাকা তুলে নেওয়া অত্যন্ত জঘন্য দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কীভাবে সরকারি কর্মকর্তারা পার পেয়ে যান এবং আগের তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয় না—এই ঘটনা তারই বড় প্রমাণ।"

তিনি আরও বলেন, "শুধু পদায়ন বা বদলি নয়, দুদক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচিত এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।"