ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৪:২৪:২৩ AM

জাল সনদের অভিযোগ রাশেদুলের বিরুদ্ধে

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
27-09-2026 07:28:05 PM
জাল সনদের অভিযোগ রাশেদুলের বিরুদ্ধে

রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে (এমপিএল) তীব্র প্রশাসনিক অরাজকতা, পদোন্নতি ও বদলিতে অনিয়ম, আধুনিকায়নে স্থবিরতা এবং জ্বালানি তেল চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এমআই) মো. রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদে চাকরি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য, ডিপো থেকে মাসিক চাঁদা আদায়, মামলা পরিচালনার নামে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল তৈরি করে টাকা নেওয়া এবং কোম্পানির গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনের মতো অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মো. রাশেদুল হক প্রায় ১৫ বছর ধরে একই স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০১২ সালের ১ নভেম্বর মেঘনা পেট্রোলিয়ামে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানির সার্ভিস নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণ শাখার সপ্তম গ্রেডের অফিসার পদের জন্য প্রথম বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রির পাশাপাশি তিন বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কারিগরি শাখার দুই গ্রেড উপরের পঞ্চম গ্রেডের বিএসসি পাস পদের ক্ষেত্রে ভুয়া সনদের মাধ্যমে ছাড় নিয়ে তিনি নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নিয়োগ নথি ও সনদ যাচাই করে বিষয়টির সত্যতা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর কোম্পানির পদোন্নতি নীতিমালার ১৪.১ ও ১৪.৩ ধারা লঙ্ঘন করে বিভাগীয় শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে চারজন কর্মকর্তাকে সরাসরি ম্যানেজার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন প্রশাসনের সময়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ওই চার কর্মকর্তাকে সরাসরি ম্যানেজার করা হয়েছিল।

একই কর্মস্থলে রাশেদুল হকের দীর্ঘদিন অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, একই কর্মস্থলে এত দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান বদলি নীতিমালার পরিপন্থী। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের ভেতরে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য, বিভিন্ন ডিপো থেকে মাসিক চাঁদা আদায়, মামলা পরিচালনার নামে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ এবং কোম্পানির গাড়ি বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত কাজে ভাড়ায় ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনের মতো নানা অনিয়মে রাশেদুল হক জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন ডিপো থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এমনকি অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন ডিপো থেকে প্রতি মাসে প্রায় কোটি টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজেকে ছাত্রলীগের বড় নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পেতেন না বলেও অভিযোগকারীদের দাবি। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে বলে তারা জানান।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে রাশেদুল হক কোম্পানির ভেতরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থে তার নিজ এলাকা ভোলায় বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ, দামি গাড়ি কেনা এবং স্ত্রী ও সন্তানদের নামে মোটা অঙ্কের এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র করার তথ্য রয়েছে। এসব সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই করে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম/অপা.) মুজিবুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে এসব অর্থের একটি অংশ তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ থেকে শুরু করে কোম্পানির সিবিএ নেতাদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, রাশেদুল হক ওসি বা বাল্ক ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় কোটি কোটি টাকার তেল চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং এর মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।

রাশেদুল হকের নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়েও রয়েছে একাধিক প্রশ্ন। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১ নভেম্বর তার যোগদানের সময় কোম্পানির সাধারণ শাখার সপ্তম গ্রেডের অফিসার পদের জন্য প্রথম বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রি ও তিন বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি কারিগরি শাখার দুই গ্রেড উপরের পঞ্চম গ্রেডের বিএসসি পাস পদে ভুয়া সনদ দেখিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২১ সালের নভেম্বরের কোম্পানির পদোন্নতি নীতিমালার ১৪.১ ও ১৪.৩ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে।

তেল চুরি ও অপচয়ের অভিযোগেও রাশেদুল হকের নাম উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা প্রধান স্থাপনা বা মেইন ইনস্টলেশন মেঘনা পেট্রোলিয়ামের তেল সংরক্ষণ ও বিতরণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। অভিযোগ অনুযায়ী, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের উপমহাব্যবস্থাপক (পরিচালন) মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং মেইন ইনস্টলেশনের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মো. রাশেদুল হক একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের প্রত্যক্ষ ছত্রচ্ছায়া ও সহায়তায় পতেঙ্গা প্রধান স্থাপনা থেকে দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরি, অবৈধ তেল পাচার এবং তেলের অপচয়ের মতো অনিয়ম চলেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মেঘনা পেট্রোলিয়ামের তেল বিপণন ও বিভিন্ন ডিপোর কার্যক্রমে প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রাশেদুল হককে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন ডিপো থেকে নিয়মিত মাসিক চাঁদা আদায় করা হতো। তাদের দাবি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে গোপনে এসব অর্থ আদায় করা হতো। তবে নিরাপত্তার কারণে তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

রাশেদুল হকের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট তেল চুরির অবৈধ কারবারের সঙ্গে যুক্ত বলেও অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য এবং স্থানীয় চোরাকারবারিদের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে জ্বালানি সংকটের সময় শত শত কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এক কর্মকর্তা বলেন, “চাকরির অন্তরালে তেল চুরি, তেল পাচার ও তেলে ভেজাল দেওয়াই হচ্ছে তার প্রধান কাজ।”

কোম্পানির ভেতরে রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও অতীতে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে একাধিকবার তদন্ত প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্তের আওতায় আসেনি।

মেঘনা পেট্রোলিয়ামের টেকসই উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সব গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদায়নের দাবি জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ।

আন্দোলনরত ও ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, “উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পেছনে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে প্রচলিত আইন ও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে সরকারের অবিলম্বে জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক উপপরিচালক বলেন, “যদি কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায় বা পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক প্রমাণ মেলে, তাহলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “একজন সরকারি কর্মকর্তা জাল সনদে নিয়োগপ্রাপ্ত, নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য, ডিপো থেকে মাসিক লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়, মামলা পরিচালনা থেকে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ করে রাষ্ট্রের চরম পর্যায়ের আইন ও সীমা লঙ্ঘন করেছেন। এবং তার অর্জিত বৈধ আয়ের সঙ্গে যদি তার সম্পদের পরিমাণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেটি দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।”