বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশের সামরিক নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। দীর্ঘ চার দশকের সামরিক জীবনে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশ-বিদেশে পেশাগত দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২৩ জুন ২০২৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৮তম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস), সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) এবং সেনা সদর দপ্তরের সামরিক সচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের জন্ম ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৬ সালে। তাঁর পৈতৃক নিবাস শেরপুর জেলায়। তিনি বাংলাদেশের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ থেকে উচ্চতর সামরিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সামরিক কৌশল, নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তিনি একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৮৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, একটি পদাতিক ব্রিগেড এবং একটি পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকস এবং সেনা সদর দপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে তিনি সেনা সদর দপ্তরের সামরিক সচিব হিসেবে নিয়োগ পান এবং পরবর্তীতে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর তিনি আর্মি সার্ভিস কোরের সপ্তম কর্নেল কমান্ড্যান্ট হিসেবে অভিষিক্ত হন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি অ্যাঙ্গোলা ও লাইবেরিয়ায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সিনিয়র অপারেশন অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে এই অভিজ্ঞতা তাঁর নেতৃত্ব, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
২০২৪ সালের ২৩ জুন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৮তম সেনাপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর প্রধান দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সেনাবাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি ঐতিহাসিক মোড় নেয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি শান্তি, সংযম এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার কথা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল ও ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শেষে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় এবং ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে নতুন সরকারের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন।
অনেক পর্যবেক্ষক ও সাধারণ নাগরিকের মতে, ৫ আগস্টের সংকটময় পরিস্থিতিতে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সিদ্ধান্ত দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁদের মতে, তিনি সেনাবাহিনীকে সংযত থাকার নির্দেশ দেন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন। এই মূল্যায়ন অনুযায়ী, তাঁর সিদ্ধান্তের ফলে সহিংসতা আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা কমে এবং রাজনৈতিক রূপান্তর তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। তবে এসব মূল্যায়ন মূলত বিশ্লেষক, গণমাধ্যম ও জনমতের বিভিন্ন অংশের মতামতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং এ বিষয়ে ভিন্ন মতও বিদ্যমান।
ব্যক্তিগত জীবনে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের স্ত্রী বেগম সারাহনাজ কমলিকা। তাঁদের দুই কন্যা রয়েছেন। তিনি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের জামাতা। তাঁর পারিবারিক পরিচয় বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এলেও তাঁর সামরিক জীবন মূলত পেশাগত দায়িত্ব, নেতৃত্ব এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হয়ে থাকে।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নেতৃত্ব সম্পর্কে জনমতের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। একদল মানুষ তাঁকে একজন দক্ষ, বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ সেনাপ্রধান হিসেবে বিবেচনা করেন এবং মনে করেন, সংকটময় সময়ে তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক মহল তাঁর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন বিদ্যমান।
বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল নূরউদ্দিন খান, জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানসহ একাধিক সেনাপ্রধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কে সবচেয়ে সফল বা শ্রেষ্ঠ সেনাপ্রধান—এটি মূলত ইতিহাসবিদ, গবেষক ও সাধারণ মানুষের মূল্যায়নের বিষয়; এ বিষয়ে সর্বজনস্বীকৃত কোনো সরকারি বা একক র্যাঙ্কিং নেই। তাই জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের অবস্থানও সময়ের সঙ্গে ইতিহাস, গবেষণা এবং জনগণের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ ও পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দেশের সামরিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় তাঁর ভূমিকা দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশংসা ও সমালোচনা—উভয়ই রয়েছে। ভবিষ্যতে তাঁর নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত এবং অবদান বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে কীভাবে মূল্যায়িত হবে, তা নির্ভর করবে ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ, গবেষণা এবং সময়ের বিচারের ওপর।