ঢাকা, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০২:৫৭:৫৩ AM

কৌশল, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
26-07-2026 11:34:51 AM
কৌশল, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা

গত তিন দশকে বিশ্ব উৎপাদন ব্যবস্থায় চীনের উত্থান অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত ঘটনা। একসময় জাপান, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেসব শিল্পে নেতৃত্ব দিত, আজ সেসবের অনেক ক্ষেত্রেই চীন প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, সৌর প্যানেল, ইস্পাত, রেয়ার আর্থ প্রসেসিং এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পরিশোধন শিল্পে চীনের অগ্রগতি বিশ্ববাজারের ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র-সমর্থিত শিল্পনীতি, বিপুল বিনিয়োগ, উৎপাদন দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আক্রমণাত্মক মূল্যনীতি।

চীনের শিল্প কৌশলের প্রথম ধাপ হলো সম্ভাবনাময় কোনো খাতকে কৌশলগত শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা। এরপর সরকার ওই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করে। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প সুদের ঋণ, তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ, শিল্পাঞ্চলে জমি বরাদ্দ, কর-সুবিধা এবং অবকাঠামোগত সহায়তা। এসব পদক্ষেপের ফলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করে।

দ্বিতীয় ধাপে চীনা কোম্পানিগুলো কম দামে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা অত্যন্ত কম মুনাফায়, এমনকি কিছু সময়ের জন্য লোকসান স্বীকার করেও বাজারে অবস্থান ধরে রাখে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য দ্রুত বাজার দখল এবং প্রতিযোগীদের মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেওয়া। সরকারের আর্থিক সহায়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের মূল্যনীতি অনুসরণ করতে সক্ষম হয়েছে।

তৃতীয় ধাপে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীরা ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়ে। তুলনামূলক বেশি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বহু প্রতিষ্ঠান বাজার হারায়, উৎপাদন কমিয়ে দেয় অথবা কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি শিল্পে গত এক দশকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

চতুর্থ ধাপে বাজারে শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠার পর চীন সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে। এর ফলে শুধু উৎপাদন নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ, মূল্য এবং কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণেও তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বিশ্ববাজারে মূল্য নির্ধারণ এখনও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, বিকল্প উৎপাদক এবং বৈশ্বিক চাহিদা-সরবরাহের ওপরও নির্ভরশীল; তাই কোনো একক দেশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

চীনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কৌশল হলো খনিজ উত্তোলনের চেয়ে খনিজ পরিশোধন শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশ্বের মোট লিথিয়াম, কোবাল্ট বা রেয়ার আর্থের বড় অংশ চীনের বাইরে উত্তোলিত হলেও, এসব খনিজের উল্লেখযোগ্য অংশ চীনে পরিশোধিত হয়। ফলে কাঁচামাল অন্য দেশে উৎপাদিত হলেও ব্যবহারযোগ্য শিল্প উপাদানে রূপান্তরের একটি বড় অংশ চীনের শিল্প অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এই অবস্থান বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্প সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য বিরোধের সময় গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম এবং অ্যান্টিমনির মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এসব খনিজ সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং উন্নত প্রযুক্তি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি সীমিত হলে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি শিল্পে প্রভাব ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতি নিজেদের শিল্পনীতি পুনর্বিবেচনা শুরু করেছে। দীর্ঘদিন মুক্তবাজারভিত্তিক নীতির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও বর্তমানে তারা দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে সরকারি সহায়তা ও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের CHIPS and Science Act এবং Inflation Reduction Act-এর মতো উদ্যোগ এরই উদাহরণ। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহে বিকল্প উৎস গড়ে তোলার চেষ্টাও জোরদার হয়েছে।

এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতেও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা দ্রুত তীব্র হচ্ছে। চীনের কিছু প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক (Open Source) এআই মডেল প্রকাশের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো উন্নত মালিকানাভিত্তিক (Proprietary) এআই মডেল এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব নির্ধারণে উভয় ধরনের মডেলেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।

সব মিলিয়ে চীনের শিল্প উত্থান কোনো একক কারণে সম্ভব হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সরকারি সহায়তা, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য—এসবের সমন্বয়ই দেশটিকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে এ ঘটনাপ্রবাহ অন্যান্য অর্থনীতিকেও শিল্পনীতি পুনর্গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছে। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রতিযোগিতা হবে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, খনিজ সম্পদ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে। এই প্রতিযোগিতার ফলাফলই আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শিল্প ব্যবস্থার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।