বহুল আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ড’-এর বাইরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে আরও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) বিশেষ নিরীক্ষা এবং আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত নয় বছরে প্রকল্পে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অডিট আপত্তি উঠেছে। অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বল তদারকির মতো নানা অনিয়ম প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরুতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরে ব্যয় প্রায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায়। এ পর্যন্ত প্রকল্পে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে। প্রথম পাঁচ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে অডিট আপত্তির পরিমাণ ছিল ১০৬ কোটি টাকা, যা পরের বছর বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকায় পৌঁছে। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ওই বছর ১৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ১৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকার অডিট আপত্তি তোলে ফাপাড। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ৩ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকার আপত্তি রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে রূপপুর প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পে, যেখানে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের জন্য আবাসন নির্মাণ করা হয়েছে। মোট ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টিই এই প্রকল্প-সংক্রান্ত। নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র ক্রয় এবং বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিরীক্ষকদের মতে, বিভিন্ন সরঞ্জাম সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দরপত্রে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের আড়ালে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়। নিরীক্ষা অনুযায়ী, এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা। কিন্তু একই সরঞ্জাম কিনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ফলে শুধু এই খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা। একটি ভবনের ক্ষেত্রে সরকারি মূল্য ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা হলেও বিল করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যেখানে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত অনিয়ম ছিল ‘বালিশ-কাণ্ড’। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়। এর মধ্যে ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। প্রকৃত মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হলেও এসব বালিশ কিনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এতে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে নিরীক্ষকদের মতে, এটি সামগ্রিক অনিয়মের তুলনায় একটি ছোট অংশ মাত্র। গ্রিন সিটির ২০টি আবাসিক ভবনের নির্মাণ ও ক্রয় কার্যক্রমে প্রায় ২৯৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্যও উঠে এসেছে।
আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি এবং দ্বিতীয় ইউনিটেও একই ধরনের বিলম্বের আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্প দপ্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কোনো হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা কিংবা অসমাপ্ত কাজের তালিকাও পাওয়া যায়নি। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের প্রতিবছর কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পর নতুন কোনো পরিকল্পনা জমা দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আইএমইডি দ্রুত হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা সংগ্রহ, অসমাপ্ত কাজের তালিকা প্রস্তুত এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজের প্রতিটি ধাপে কার্যকর দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুসরণে গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর মতে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তদারকি ও সুপারভিশনের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও এ দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।