ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১১:২৪:১৬ AM

'আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবস' পালিত

আফসানা আরেফিন
30-07-2026 09:18:22 AM
'আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবস' পালিত

​প্রতি বছর ২৯ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় 'আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবস'। সকাল থেকেই চোখ রাখছিলাম দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, যুগান্তরসহ দেশের বেশ কয়েকটি প্রথম সারির পত্রিকায় লিপস্টিক দিবস উপলক্ষে বিশেষ ফিচার ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কোনো খবরে উঠে এসেছে এর প্রাচীন ইতিহাস—কীভাবে ক্লিওপেট্রার লাল ঠোঁট কিংবা মেসোপটেমিয়ার গুঁড়ো পাথরের প্রসাধনী আধুনিক সুইভেল-আপ কেসিংয়ে এসে ঠেকলো। আবার কোনো প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে নারীদের আত্মপ্রকাশ, ফ্যাশন আর প্রতিবাদের রঙ হিসেবে লিপস্টিকের ভূমিকা।
​সংবাদপত্রের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভাবছিলাম একটি সামান্য লাল বা গোলাপি রঙের কাঠি কীভাবে সমাজ, মনস্তত্ত্ব এবং বিশ্ব সংস্কৃতির এক বিরাট অংশ হয়ে উঠলো! তবে এই সার্বজনীন উদযাপনের মাঝেও আমার নিজের ভেতর এক ধরণের দ্বিধা আর আত্মবীক্ষণ তৈরি হলো। লিপস্টিক বা কৃত্রিম সাজগোছ বিশ্বজুড়ে নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে জায়গা করে নিলেও আমার কাছে এটি সবসময়ই কিছুটা কৃত্রিম ও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। ফলে তা দিয়ে নিজেকে সাজানোর ভাবনা কখনো মনের ভেতর কাজ করেনি।
​পশ্চিমা বিশ্বে লিপস্টিকের অবস্থান শুধু প্রসাধনীতেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি নারীর স্বাধীন সত্তা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিবাদেরও প্রতীক। ১৯১২ সালে নিউইয়র্কে নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের (Suffragette movement) সময় নারীরা মিছিলে লাল লিপস্টিক মেখে নেমেছিলেন সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন সবকিছুর সংকট ছিল তখনও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল লিপস্টিকের উৎপাদন বন্ধ করেননি কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এটি নারীদের মানসিক মনোবল ধরে রাখতে সাহায্য করে।
​বর্তমানে ইউরোপ বা আমেরিকার নারীদের কাছে লিপস্টিক দৈনন্দিন আত্মবিশ্বাসের অন্যতম অনুষঙ্গ। বিশ্বজুড়ে চারজন নারীর মধ্যে একজন মনে করেন লিপস্টিক না লাগালে তাঁদের সাজ বা প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেখানে কালচে, ন্যুড, লাল কিংবা নিয়ন রঙে ঠোঁট সাজানোকে দেখা হয় ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠ বহিপ্রকাশ হিসেবে। ফরাসি বা ইতালীয় নারীদের কাছে হালকা একটু লিপস্টিক লাগানোটা যেন সকালের কফির মতোই স্বাভাবিক এক অভ্যাস।

​উপমহাদেশীয় সমাজে প্রসাধনীর ইতিহাস অতি প্রাচীন হলেও লিপস্টিক বা সাজগোছকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটা বেশ দ্বিমুখী। দক্ষিণ এশিয়ায়—বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানে একসময় ঠোঁটে রঙ মাখাকে কিছুটা সামাজিক সংস্কার ও শাসনের চোখে দেখা হতো। রক্ষণশীল পরিবারগুলোতে গাঢ় লাল লিপস্টিককে ভাবা হতো 'অতিরিক্ত' বা 'সংকোচহীনতার' লক্ষণ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
​আজকের উপমহাদেশের নারীদের কাছে লিপস্টিক একাধারে উৎসবের অনুষঙ্গ এবং কর্পোরেট বা কর্মক্ষেত্রের আত্মবিশ্বাসের হাতিয়ার। বিয়ে, ঈদ, দুর্গাপূজা কিংবা পহেলা বৈশাখে ঠোঁটে একটু রঙের ছোঁয়া না থাকলে যেন বাঙালিয়ানার সাজই খোলে না। আবার অন্যদিকে উপমহাদেশের অনেক নারীই সামাজিক যে বাধ্যবাধকতা বা "সুন্দর দেখাতেই হবে" নামক অদৃশ্য যে চাপ থাকে তার বিরুদ্ধে গিয়ে ন্যাচারাল বা "নো-মেকআপ লুক" এর দিকে ঝুঁকছেন। এই অঞ্চলে সাজগোছ এখন কেবল অপরকে আকর্ষণ করার মাধ্যম নয় বরং নিজের ভালো লাগা বা মুড ভালো করার একটা নিজস্ব উপায়।

সৌন্দর্য মানেই প্রসাধিত থাকা-​বিশ্বজুড়ে মেকআপ বা লিপস্টিকের এই সার্বজনীনতার উল্টো পিঠেও কিন্তু এক বিশাল সংস্কৃতি বিদ্যমান। বিশ্বের অনেক দেশ ও সমাজে নারীরা কৃত্রিম প্রসাধনী এড়িয়ে চলেন এবং মেকআপ ছাড়াই জীবনযাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
​উদাহরণস্বরূপ সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্কের মতো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর কথা বলা যায়। সেখানে 'Lagom' (খুব বেশিও নয়, খুব কমও নয়—ঠিক যতটুকু প্রয়োজন) নামক এক জীবনদর্শন চর্চা করা হয়। এখানকার নারীরা কেমিক্যালযুক্ত প্রসাধনীর চেয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, প্রাকৃতিকভাবে প্রাণবন্ত ত্বক এবং পরিচ্ছন্নতাকে বেশি প্রাধান্য দেন। ​আইসল্যান্ডে যেখানে লিঙ্গ সমতা বিশ্বের শীর্ষে সেখানে নারীদের আসল পরিচয় বিবেচিত হয় তাঁদের জ্ঞান, কাজ ও যোগ্যতায়। বাহ্যিক সাজগোছে নয়। সেখানে প্রসাধনী দিয়ে কৃত্রিম সুন্দর হওয়ার চেষ্টা বা চাপকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়। আবার প্যারিসের বাইরে ফ্রান্সের অনেক অঞ্চলেই "Effortless Beauty" বা অনায়াস সৌন্দর্যের ব্যাপক চর্চা রয়েছে। যেখানে মুখে ভারি প্রসাধনীর প্রলেপ দেওয়াকে ব্যক্তিত্ব ঢেকে ফেলার শামিল বলে গণ্য করা হয়।
​এছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় বা ঐতিহ্যবাহী সম্প্রদায় (যেমন আমেরিকার আমীশ জনগোষ্ঠী) অথবা বিভিন্ন আদিবাসী সংস্কৃতিতে কৃত্রিম রূপচর্চাকে অহংকার পরিহার ও নম্রতা রক্ষার স্বার্থে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা হয়। ​নারীরা কেন প্রসাধনী এড়িয়ে চলেন তার কারণগুলোও বেশ গভীর। যেমন - ​প্রাকৃতিক সুস্থতা: প্রসাধনীর রাসায়নিক উপাদান থেকে ত্বককে মুক্ত রাখা।
​নারীবাদী সচেতনতা: সৌন্দর্যশিল্পের (Beauty Industry) তৈরি করা "সুন্দর দেখাতেই হবে" নামক সামাজিক বাধ্যবাধকতা বা পুরুষতান্ত্রিক চাহিদার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
​সময় ও অর্থের সঠিক ব্যবহার: মেকআপের পেছনে সময় ও অর্থ ব্যয় না করে তা ক্যারিয়ার, জ্ঞানচর্চা কিংবা আত্মউন্নয়নে ব্যয় করা।
​স্বকীয়তায় বিশ্বাস: নিজের মুখের ছোটখাটো খুঁত বা বৈশিষ্ট্যগুলোকে আত্মবিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করা।

সবমিলিয়ে ​আমার উপলব্ধি হচ্ছে কৃত্রিমতার ভিড়ে স্বাভাবিকতার সন্ধান,
​পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদন এবং বিশ্বজুড়ে মানুষের এই উল্লাস দেখেও যখন নিজের দিকে তাকাই তখন এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হই। আমাকে লিপস্টিক বা যেকোনো অতিরিক্ত কৃত্রিম সাজগোছ কখনোই টানেনি। কেন যেন মনে হয় কেমিক্যাল বা রঙের প্রলেপে নিজের আসল ত্বক আর চেহারাকে ঢেকে ফেলার মধ্যে এক ধরণের কৃত্রিমতা রয়েছে। ​অনেকের কাছে লিপস্টিক বা মেকআপ পরা মানেই আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। কিন্তু আমি মনে করি কারো কারো হয়ত আত্মবিশ্বাস আসে ভেতর থেকে তার চিন্তা, কাজ, কথা এবং ব্যক্তিত্ব থেকে। নিজের চেহারায় যে স্বাভাবিকতা, যে ছোট ছোট খুঁত বা বৈশিষ্ট্য আছে সেটাই মানুষের আসল সৌন্দর্য অর্থাৎ সত্যকে গ্রহণ করার প্রবণতা।  যখন আমি মুখে কৃত্রিম কোনো রঙ বা মেকআপের প্রলেপ লাগাই তখন আয়নায় নিজেকে নিজের কাছেই অপরিচিত মনে হয়। তখন কেমন যেনো মনে হয় মুখোশের আড়ালে আসল আমিটা হারিয়ে যাচ্ছি। ​কোনো প্রসাধনী ব্যবহার না করে নিজের স্বাভাবিক চামড়া ও হাসিটুকু নিয়ে বাইরে বের হওয়ার ভেতরে যে স্বস্তি ও সততা আছে কৃত্রিম সাজে তা কখনোই খুঁজে পাওয়া হয় না যেনো আমার। তাই আমার কাছে সৌন্দর্য মানে পরিচ্ছন্নতা, সজীবতা এবং নিজের স্বকীয়তাকে, প্রকৃতি প্রদত্ত খুঁতকে নিঃসঙ্কোচে মেনে নেওয়া। ঠোঁটে প্রসাধনীর প্রলেপ না থাকলেও যে একজন নারী পূর্ণাঙ্গ, স্বাবলম্বী এবং সুন্দর হতে পারেন এই সত্যটি মেনে নিতে নারী পুরুষ উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনবোধ গভীরভাবে মিশে আছে। মূলত
​সার্বজনীন স্বাচ্ছন্দ্যই আসল সৌন্দর্য। ​বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশই হওয়া উচিত সৌন্দর্য চর্চার মূল উদ্দেশ্য।
​আমি মনে করি এই সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি ব্যক্তিগত হওয়া উচিত। যিনি ঠোঁটে গাঢ় লাল বা গোলাপি লিপস্টিক মেখে নিজেকে শক্তিশালী ও সুন্দর মনে করেন তাঁর উদযাপনকে যেমন সম্মান জানানো উচিত ঠিক তেমনি যিনি কোনো রঙ না মেখে নিজের স্বাভাবিক ত্বক নিয়ে ঘরে বা বাইরে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তাঁর পছন্দকেও সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ​আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবসও আমাদের এই বৈচিত্র্যকেই মনে করিয়ে দেয়। বিশ্বের শত কোটি নারী প্রতিদিন কত ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে নিজেদের প্রকাশ করছেন! কেউ ঠোঁটে রঙের তুলি এঁকে আত্মবিশ্বাসের গল্প লিখছেন আবার কেউ বা কৃত্রিম সাজকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজের প্রাকৃতিক খুতময় সৌন্দর্যকে ভালোবেসে বাঁচছেন। প্রসাধনী থাকুক বা না থাকুক নারী তার নিজ নিজ অবস্থানে স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীন থাকতে পারলেই এই ধরণের উদযাপনের আসল সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে।

লেখক : কবি, সাহিত্যিক ও এমফিল গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।