ঢাকা, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০২:৫২:৩৬ AM

পলাশের বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
24-07-2026 04:15:12 PM
পলাশের বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অথরাইজড অফিসার এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১ শাখার উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) পলাশ সিকদারের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান জোরদার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের বিষয়ে সম্প্রতি দুদকের সেগুনবাগিচা প্রধান কার্যালয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক মানসী বিশ্বাস। দুদক সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

দুদকের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বেতন ও ভাতা বাবদ পলাশ সিকদারের মোট আয় প্রায় ৩৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৮১ টাকা। তবে দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, একই সময়ে তার নামে ও বেনামে প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পদ অর্জিত হয়েছে। পাশাপাশি তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে, যা বর্তমানে অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, পিরোজপুরের নেছারাবাদে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ, তার মেজো বোনের নামে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণ, বাবার নামে ৩৫ লাখ টাকায় ১ একর ২৫ শতাংশ জমি ক্রয় এবং রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় শ্যালকের নামে ৫ কাঠার একটি প্লটে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব সম্পদের অর্থের উৎস অনুসন্ধান করছে দুদক।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তিনি প্রায় ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়ি ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নথি অনুযায়ী গাড়িটি আফসানা মরিয়ম নামে এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। বিষয়টি যাচাই করছে দুদক। একই সঙ্গে প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে ভূমিহীন হিসেবে দেখিয়ে সরকারি এক একর জমি বন্দোবস্ত নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০২৫-২০২৬ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, পলাশ সিকদার তার বার্ষিক করযোগ্য চাকরিজনিত আয় ৫ লাখ ৪৮ হাজার ১০০ টাকা উল্লেখ করেছেন। একই রিটার্নে তার নিট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৯৮ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ টাকা। নথি অনুযায়ী, বছর শেষে তার ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল ১২ হাজার ১৬৪ টাকা, হাতে নগদ ছিল ৭২ লাখ ৮৯ হাজার ১০ টাকা এবং ১০ লাখ টাকার প্রাইজবন্ডের মালিকানা দেখানো হয়েছে। এছাড়া পিরোজপুর ও কুমিল্লায় জমির মালিকানার তথ্যও রিটার্নে উল্লেখ রয়েছে। রিটার্নে ৫০ ভরি স্বর্ণের তথ্য থাকলেও এর আর্থিক মূল্য শূন্য টাকা দেখানো হয়েছে। একই নথিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রায় ২০ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ পেয়েছেন।

তার স্ত্রী ফারজানা আক্তারের আয়কর রিটার্নেও উল্লেখযোগ্য সম্পদের তথ্য রয়েছে। রিটার্ন অনুযায়ী, তার বার্ষিক ব্যবসায়িক আয় ৫ লাখ টাকা এবং নিট সম্পদের পরিমাণ ৪৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ব্যবসায়িক সম্পদের মধ্যে নগদ ও ব্যাংক ব্যালেন্স প্রায় ৩৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, হাতে নগদ ৮ লাখ টাকা এবং ২ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার রিটার্নেও ৫০ ভরি স্বর্ণের তথ্য থাকলেও এর মূল্য শূন্য টাকা দেখানো হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং রাজউকের দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নকশা অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রসংক্রান্ত কাজে অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করা হয়েছে। এছাড়া একটি বহুতল ভবনের নকশা জালিয়াতির অভিযোগেও পৃথক অনুসন্ধান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং অভিযোগগুলো তদন্তাধীন রয়েছে।

রাজউকের একাধিক সূত্রের দাবি, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তার বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে রাজউকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, সম্প্রতি নিজের প্রশাসনিক অবস্থান পুনর্বহালের লক্ষ্যে তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

এ ছাড়া, তৎকালীন সরকারের সাবেক মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার একটি আবাসন প্রকল্পে জমি কেনা এবং অন্য কর্মকর্তাদেরও সেখানে জমি কিনতে উৎসাহিত করার অভিযোগও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং এ বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলও প্রকাশিত হয়নি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে পলাশ সিকদার গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি সাধু নই, আপনি নিউজ করেন।” তবে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।