সাতক্ষীরা সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অফিসে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি এবং ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর স্বয়ং সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: বদরুদ্দোজা এবং সদর ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) শর্মিষ্ঠা সরকারের দিকে। ভুক্তভোগীদের দাবি, টাকা ছাড়া এই অফিসে কোনো কাজ হয় না। সার্ভেয়ার, অফিস সহকারী থেকে শুরু করে পুরো চক্রটি এক জটিল দুর্নীতি সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে, যার প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকার।
সেবাগ্রহীতাদের ফাঁদে ফেলার প্রক্রিয়া:
অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো সেবাগ্রহীতা অফিসে প্রবেশ করা মাত্রই এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাঁকে ঘিরে ধরে নায়েব শর্মিষ্ঠার কাছে নিয়ে যান। প্রথমে আইনি জটিলতা ও খোড়া যুক্তি দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগীরা ঘুষের চুক্তিতে আবদ্ধ হন। শর্মিষ্ঠার চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারিত টাকা পরিশোধের পর ফাইল পাঠানো হয় এসিল্যান্ডের টেবিলে। নায়েব শর্মিষ্ঠার 'গ্রীন সিগন্যাল' মিললেই কেবল এসিল্যান্ড ফাইলে স্বাক্ষর করেন।
ঘুষের নির্ধারিত হার ও হয়রানি:
সরজমিনে ও অনুসন্ধানে জানা যায়, সদর ভূমি অফিসে সরকারি ফির বাইরে টেবিল প্রতি ঘুষের টাকা দিতে হয়। নামজারির (খারিজ) জন্য ৬ হাজার, প্রতিবেদনে ২ হাজার, খাজনা দাখিলায় ১ হাজার এবং বিতর্কিত বা ঝামেলাপূর্ণ জমির ক্ষেত্রে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
এছাড়া, শর্মিষ্ঠার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তিনি প্রায়শই নিজের কাজ ফেলে এসিল্যান্ডের কক্ষে অবস্থান করেন এবং প্রশাসনিক তদন্তে গাড়িতে সাথে থাকেন। ফলে অফিসে এসে সেবাগ্রহীতারা ঘণ্টায় পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে চরম দুর্ভোগে পড়েন। অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হন এবং নিজেকে এসিল্যান্ডের ঘনিষ্ঠ দাবি করে ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যক্তিগত বিতর্ক ও সাময়িক বদলি:
কার্যালয় ও জেলাজুড়ে এসিল্যান্ড ও নায়েবের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে নানা আলোচনা সৃষ্টি হয়। এর পাশাপাশি, অনিয়ম ঢাকতে মুস্তফা রায়হান নামের এক গণমাধ্যমকর্মীর সাথে সখ্য ও পরবর্তীতে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে নায়েবের বিরুদ্ধে। তাঁদের যোগাযোগের অডিও কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই গণমাধ্যমকর্মীর কাছ থেকেও বিভিন্ন উপহার ও অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন শর্মিষ্ঠা।
ঘনিষ্ঠতা ও দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা বৃদ্ধি পেলে কৌশলগত কারণে শর্মিষ্ঠাকে পার্শ্ববর্তী ফিংড়ী নায়েব অফিসে বদলি করা হয়। তবে বদলি হলেও তিনি সদর উপজেলার আওতাতেই থেকে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি নিজ কর্মস্থল ফাঁকি দিয়ে প্রায়শই সদর এসিল্যান্ডের কার্যালয়ে গিয়ে সময় কাটান। অন্যদিকে, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে সেবাগ্রহীতাদের ফাইল খারিজ করে রাখা হয়, যা পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের চুক্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও ক্ষোভ:
আদালতের রায়ে জমির নামজারি করতে আসা ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের গীতা রানী জানান, সার্ভেয়ার তারেকের মাধ্যমে নায়েব শর্মিষ্ঠা তাঁর কাছে প্রথমে ২ লাখ টাকা দাবি করেন। পরবর্তীতে কান্নাকাটি করলে ১ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। ঘটনার অডিও ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে পৌঁছেছে। গীতা রানী এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
অন্য এক ভুক্তভোগী ফারুক হোসেন অভিযোগ করেন, ১৪৫ ধারার মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য তাঁর কাছে টাকা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় বিরোধী পক্ষের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন জমা দেন শর্মিষ্ঠা। এ নিয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। ভুক্তভোগীরা শর্মিষ্ঠাকে 'ঘুষের মহারাণী' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অভিযুক্তদের বক্তব্য:
অভিযোগের বিষয়ে নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকার সকল অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ঘনিষ্ঠতার দাবি অস্বীকার করে বলেন, "আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সত্য নয়। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অবগত আছেন এবং তাঁরাই দেখবেন। এ নিয়ে আমি মোটেও চিন্তিত নই।"
অন্যদিকে, সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: বদরুদ্দোজা জানান, "আমার অফিসে কোনো ঘুষ বাণিজ্য চলে না। নায়েব শর্মিষ্ঠা যদি কর্তৃপক্ষের নাম ব্যবহার করে থাকেন, তবে তা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে তিনি শাস্তি পাবেন। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।"