ঢাকা, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১০:১৪:২৭ PM

গণপূর্তে হাতিলের অঘোষিত রাজত্ব

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
29-07-2026 08:59:16 PM
গণপূর্তে হাতিলের অঘোষিত রাজত্ব

সরকারি স্থাপনায় আসবাবপত্র ও ইন্টেরিয়র সরবরাহ খাতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। বঙ্গভবন, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, আদালত ভবন, সার্কিট হাউস, মডেল মসজিদ, প্রশাসনিক ভবনসহ গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়িত একাধিক বৃহৎ প্রকল্পে বারবার একই প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়াকে কেন্দ্র করে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড সরকারি আসবাব সরবরাহের বাজারে অঘোষিত একচ্ছত্র অবস্থান তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধেও সরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৬ সালে দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের আওতায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগ মোট ১২টি পৃথক দরপত্র আহ্বান করে। গত ৮ জুন পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া দরপত্র মূল্যায়নে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড ১২টির মধ্যে ৮টিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। তবে মূল্যায়ন শেষ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র একটি কার্যাদেশ জারি করা হয়েছে। বাকি সাতটি কার্যাদেশ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কার্যাদেশ বিলম্বিত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির শুরু হয়। কার্যাদেশ দ্রুত দেওয়ার দাবিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কাছে লিখিত অভিযোগও পাঠানো হয়।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. রেজাউল করিম গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) জোন আশ্রাফুল হকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। একই আবেদন জেলা হাসপাতাল উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়। অভিযোগপত্রে ই/এম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই বড় সরকারি প্রকল্পে হাতিলের ধারাবাহিক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মডেল মসজিদ, সার্কিট হাউস, আদালত ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় আসবাবপত্র সরবরাহের কাজ প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত পেয়ে আসছে। সরকারি ক্রয় আইনের মূল উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবে একই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক সাফল্য অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, হাতিলের সঙ্গে অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলীর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তার দাবি, শুরুতে কিছু প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণে ভুয়া কাজের সনদ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে বড় বড় প্রকল্পে তাদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। তার ভাষ্য, নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হাতিল শুধু দরপত্রে অংশ নিয়েই থেমে থাকেনি; কার্যাদেশ আটকে গেলে প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টিরও চেষ্টা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কাজের উল্লেখযোগ্য অংশ পাওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যাদেশ বিলম্বিত হওয়ায় বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগপত্র পাঠানো সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা কি না—সেই প্রশ্নও উঠেছে।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দার বলেন, "দরপত্র মূল্যায়নের কাজ এখনও চলমান। চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো কার্যাদেশ দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারি বিধি অনুসারেই সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে।" নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক খোরশেদ আলমের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "একটি প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি টেন্ডারের উল্লেখযোগ্য অংশ পেয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত। একচেটিয়া আধিপত্য স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।"

সুশাসন বিশ্লেষক জান্নাতুর রহমান বলেন, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানো বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় একই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক আধিপত্য, একাধিক মেগা প্রকল্পে পুনরাবৃত্ত অংশগ্রহণ, কার্যাদেশকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক তৎপরতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি বিস্তৃত তদন্তের দাবি রাখে। তাদের মতে, গত এক দশকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতায় আসবাবপত্র সরবরাহসংক্রান্ত সব বড় প্রকল্প, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, দরপত্র মূল্যায়নের নথি, কার্যাদেশ এবং বাস্তবায়িত কাজের তথ্য স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হলে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী বলয় গড়ে উঠেছিল কি না, তার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে।