ঢাকা, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০২:৫৮:১৭ AM

হেলাল উদ্দিনের নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
26-07-2026 01:01:18 PM
হেলাল উদ্দিনের নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়

মাদারীপুর জেলা পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে নিজের, স্ত্রী ও শ্যালকের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, সরেজমিন অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তার পরিবারের নামে জমি, ফ্ল্যাট এবং অন্যান্য সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ৫৯ কোটি টাকা বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হেলাল উদ্দিন।

জানা গেছে, নবম গ্রেডের এই কর্মকর্তা বেতন ও ভাতাসহ মাসিক প্রায় ৪৫ হাজার টাকা আয় করেন। অথচ তার নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, তেজগাঁও ও কেরানীগঞ্জে একাধিক জমি ও ফ্ল্যাট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে।

হেলাল উদ্দিনের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ভাষানচর এলাকায়। তার স্ত্রী শাহিনা পারভীনের বাড়িও একই জেলায়। বর্তমানে তারা রাজধানীর আদাবরের ইবনে সিনা হাউজিং সোসাইটিতে বসবাস করছেন। পারিবারিক সূত্রে এলাকায় তাদের ১০৪ শতাংশ জমি রয়েছে বলেও জানা গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হেলাল উদ্দিন দীর্ঘদিন আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়েই তার সম্পদের বড় অংশ গড়ে ওঠে। পরে গত বছরের ২৮ অক্টোবর তাকে মাদারীপুরে বদলি করা হয়। জমির পাশাপাশি রাজধানীতে কয়েক কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনা এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, নিজের, স্ত্রী ও শ্যালকের নামে ঢাকা ও আশপাশে মোট ৩৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে নিজের নামে গুলশান, মোহাম্মদপুর ও বাড্ডায় রয়েছে ১৫ দশমিক ৪২ শতাংশ জমি। স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে ধানমন্ডিতে রয়েছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ জমি। এছাড়া তেজগাঁও ও কেরানীগঞ্জে স্ত্রী এবং শ্যালক হাসিবুল ইসলামের সঙ্গে যৌথ নামে রয়েছে আরও ১২ দশমিক ৯৫ শতাংশ জমি।

তথ্য অনুযায়ী, গুলশান-ভাটারা এলাকার ১৫ নম্বর মৌজায় ১৮৯৪৪ নম্বর খতিয়ানের আওতায় নিজের নামে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ আবাসিক জমি কিনেছেন হেলাল উদ্দিন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। এছাড়া বাড্ডায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং মোহাম্মদপুরে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমির বর্তমান মূল্য আনুমানিক ১৭ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ধানমন্ডির রামচন্দ্রপুর-১ মৌজায় স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। তেজগাঁওয়ের গজারিয়া-১ মৌজায় স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ নামে সাড়ে ৭ শতাংশ জমির বর্তমান মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া কেরানীগঞ্জের তারানগর মৌজায় শ্যালক হাসিবুল ইসলামের সঙ্গে যৌথ নামে কেনা ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ জমির বর্তমান মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।

জমির পাশাপাশি রাজধানীর আদাবরের ইবনে সিনা হাউজিং সোসাইটিতে একটি ফ্ল্যাটের মালিকানাও হেলাল উদ্দিনের পরিবারের নামে রয়েছে। এর বর্তমান বাজারমূল্য এক কোটি টাকার বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন মার্কেটে দোকানের মালিকানার অভিযোগও উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এসব সম্পদ কেনাবেচা ও আর্থিক লেনদেনে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। হেলাল উদ্দিনের নামে ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকে মোট পাঁচটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তার স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে পূবালী ব্যাংকে দুটি এবং আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেডে একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এছাড়া নগদ ও বিকাশের মোট ১০টি মোবাইল আর্থিক সেবা নম্বরের মাধ্যমেও লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে মো. হেলাল উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া তিনি গণমাধ্যমে কথা বলতে পারবেন না। তার ভাষ্য, “ঢাকা শহরে আমার এত টাকা নেই। যা আছে, তার ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ করা হয়েছে। এর বাইরে কেউ কোনো সম্পদের বিষয়ে অভিযোগ করলে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”

অন্যদিকে, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার দপ্তর থেকে লিখিত আবেদন করতে বলা হলে পরবর্তীতে লিখিত জবাবে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ আকারে উপস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে বর্তমানে কঠোর অবস্থানে রয়েছে অধিদপ্তর। তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করা হবে এবং তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।