ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:৪৫:০৪ AM

উপন্যাস: তোমাকে ভালবাসি

মান্নান মারুফ
16-03-2026 12:40:08 PM
উপন্যাস: তোমাকে ভালবাসি

পর্ব–

অনেকদিন কেটে গেছে। সময় যেন ধীরে ধীরে তাদের জীবনের পাতাগুলো উল্টে দিয়েছে। তবুও কিছু স্মৃতি আছে, যা সময়ের স্রোতেও মুছে যায় না। কুদ্দুছের মনেও তেমনই এক স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে ঐশি।

কলেজের সেই দিনগুলোর পর থেকে তাদের দেখা প্রায় হয়ই না। একই শহরে থেকেও যেন তারা দুই ভিন্ন পৃথিবীর মানুষ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে দূর থেকে দেখা হলেও, কোনো কথা হয় না। নীরবতা যেন তাদের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে।

এরই মধ্যে একদিন কুদ্দুছদের এলাকায় একটি বড় অনুষ্ঠান হলো। গ্রামের একজন সম্মানিত মানুষের বাড়িতে দোয়া মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। চারদিকে উৎসবের আমেজ। বাড়ির উঠোনে বড় বড় প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে, আলো ঝলমলে পরিবেশ। মানুষের ভিড়, হাসি-ঠাট্টা, গল্প—সব মিলিয়ে চারপাশ যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

কুদ্দুছও সেখানে উপস্থিত ছিল। সাদা পাঞ্জাবি পরে সে বন্ধুদের সাথে বসে ছিল। কিন্তু তার মন যেন কোথাও স্থির হচ্ছিল না। অকারণেই বারবার তার চোখ ভিড়ের দিকে চলে যাচ্ছিল।

হঠাৎ তার দৃষ্টি থেমে গেল।

দূরে, উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে ঐশি।

হালকা নীল রঙের ওড়না মাথায়, মুখে সেই চিরচেনা শান্ত ভাব। অনেকদিন পর তাকে দেখে কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—সময় যেন আবার পিছিয়ে গেছে। যেন তারা আবার সেই পুরোনো কলেজের দিনে ফিরে গেছে।

কুদ্দুছের চোখে এক অদ্ভুত আলো ফুটে উঠল।

সে ভাবল—হয়তো আজ কথা হবে।

হয়তো এতদিনের নীরবতা আজ ভেঙে যাবে।

অনুষ্ঠানের চারপাশে তখন অনেক মানুষ। কেউ গল্প করছে, কেউ হাসছে, কেউ আবার খাওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই ভিড়ের মাঝেও কুদ্দুছের দৃষ্টি বারবার গিয়ে থামছে ঐশির ওপর।

ঐশিও একবার তার দিকে তাকাল।

তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।

কিন্তু সেই দৃষ্টিতে আগের মতো কোনো উষ্ণতা ছিল না। যেন সেখানে শুধু একটুকরো নীরবতা আর অচেনা দূরত্ব।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল একটু কাছে।

তার মনে হচ্ছিল—হয়তো ঐশি নিজেই কিছু বলবে।

হয়তো বলবে—
কেমন আছো, কুদ্দুছ?”

এই ছোট্ট প্রশ্নটাই যেন তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হয়ে উঠত।

কিন্তু সময় যেন অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।

ঐশি তখন অন্য কয়েকজন মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। মাঝে মাঝে হাসছিলও। সেই হাসি দেখে কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।

একসময় তাদের মাঝে দূরত্ব খুব বেশি ছিল না।

কিন্তু আজ সেই দূরত্বটা যেন অনেক বড়।

কুদ্দুছ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল—সে যদি একটু এগিয়ে গিয়ে কথা বলে?

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা অনুভূতি তাকে থামিয়ে দিল।

তার ভেতরের অহংকার, তার আত্মসম্মান।

সে মনে মনে বলল—
না… এবার আর নয়।”

অনেক কষ্ট হলেও নিজেকে ঐশির কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়নি কুদ্দুছ।

সে আর কোনো কথা বলার চেষ্টা করল না।

তবুও তার হৃদয়ের ভেতরটা কষ্টে ভরে উঠছিল।

ঐশিকে দেখে সে সত্যিই খুব খুশি হয়েছিল। এতদিন পর তাকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে তার মনে হয়েছিল—হয়তো সব ভুল বোঝাবুঝি একদিন মিটে যাবে।

কিন্তু বাস্তবতা আবারও তাকে হতাশ করল।

কিছুক্ষণ পর ঐশি ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে গেল।

যাওয়ার সময় একবারও কুদ্দুছের দিকে তাকাল না।

কুদ্দুছ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

চারপাশে তখনো মানুষের হাসি-ঠাট্টা চলছে। মাইকে কেউ কোরআন তিলাওয়াত করছে। বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে।

কিন্তু কুদ্দুছের কাছে সবকিছু যেন হঠাৎ খুব নিঃশব্দ হয়ে গেল।

তার মনে হচ্ছিল—এই ভিড়ের মাঝেও সে ভীষণ একা।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর মানুষ ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরতে লাগল।

কুদ্দুছও বের হয়ে এল।

রাতের আকাশ তখন অদ্ভুত পরিষ্কার। দূরে তারাগুলো মৃদু আলো ছড়াচ্ছিল।

সে হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরোনো রাস্তার দিকে চলে গেল—যে রাস্তা দিয়ে একসময় তারা দুজন একসাথে কলেজে যেত।

রাস্তার দুপাশে গাছগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।

হালকা বাতাস বইছে।

কুদ্দুছ থেমে গেল।

তার মনে পড়তে লাগল অনেক পুরোনো মুহূর্ত।

ঐশির সেই হাসি, সেই লাজুক দৃষ্টি, সেই ছোট ছোট কথাগুলো।

সবকিছু যেন আজও তার হৃদয়ের কোথাও জীবন্ত হয়ে আছে।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল।

তার চোখে তখন এক অদ্ভুত ক্লান্তি।

সে মনে মনে বলল—
ভালোবাসা কি সত্যিই এত কঠিন?”

কিছু মানুষ হয়তো খুব সহজেই ভালোবাসাকে ভুলে যেতে পারে।

কিন্তু কুদ্দুছ পারছিল না।

ঐশি তাকে এড়িয়ে গেছে—এই সত্যিটা সে মেনে নিয়েছে। তবুও তার হৃদয়ের গভীরে কোথাও একটা আশার আলো রয়ে গেছে।

হয়তো কোনো একদিন আবার তারা কথা বলবে।

হয়তো কোনো একদিন ঐশি আবার আগের মতো হাসবে তার সামনে।

কিন্তু আজকের রাতটা যেন অন্যরকম।

আজকের এই নীরবতা কুদ্দুছের হৃদয়ে আরও গভীর এক শূন্যতা তৈরি করে দিল।

কারণ কখনও কখনও মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে—যেখানে কোনো ঝগড়া নেই, কোনো অভিযোগ নেই।

শুধু আছে নিঃশব্দ দূরত্ব।

আর সেই দূরত্বই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।

তার মনে হচ্ছিল—এই পথটা হয়তো অনেক দীর্ঘ।

আর সেই পথের শেষে কী আছে, সে নিজেও জানে না।

কিন্তু একটা কথা সে বুঝে গেছে—

কিছু ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না।
তারা শুধু মানুষের হৃদয়ের গভীরে নীরব কষ্ট হয়ে বেঁচে থাকে।

আর সেই কষ্টই হয়তো একদিন তাদের গল্পকে নিয়ে যাবে এক অজানা পরিণতির দিকে।

চলবে…