ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:২৮:০৭ AM

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং ও বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে শিশু অপহরণ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
11-04-2026 04:23:19 PM
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং ও বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে শিশু অপহরণ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ

চট্টগ্রামের মুন্সিপাড়া এলাকায় গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল ২০২৬) মোহাম্মদ সুমনের তিন বছর বয়সী কন্যাশিশুকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বিনপি নেতা আশিকুর রহমান মাহমুদের নির্দেশে কিশোর গ্যাংয়ের নেতা ফরহাদ হাসান এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।

মোহাম্মদ সুমন কুমিল্লা সদরের একজন নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারী ব্যবসায়ী। তাঁর অভিযোগ, বিএনপির নাম ব্যবহার করে ফরহাদ হাসান ও তাঁর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন সময় তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। অব্যাহত হুমকি ও চাঁদা দাবির কারণে তিনি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামে আত্মগোপনে ছিলেন।

সুমন জানান, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে সহায়তা চেয়ে কোতোয়ালি থানায় গেলেও পুলিশ তাঁর মামলা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে ফরহাদ হাসান, তাঁর নেতৃত্বাধীন কিশোর গ্যাং এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এটিই প্রথম নয়।

কুমিল্লার পোশাক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ দীপুর স্ত্রী সালসাবিল আক্তারের অভিযোগ, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মিরপুরের পশ্চিম বাড়ি এলাকায় তাঁর স্বামীর পৈতৃক বাড়ি থেকে মোহাম্মদ দীপুকে অপহরণ করা হয়। ওই সময় দীপু সেখানে আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানান তিনি।

মোহাম্মদ সুমনের মতো সালসাবিল আক্তারও মিরপুরের শাহ আলী থানায় অভিযোগ জানিয়ে কোনো প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেছেন।

কুমিল্লা সদরের আরও কয়েকজন বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও ফরহাদ হাসান, তাঁর নেতৃত্বাধীন কিশোর গ্যাং এবং বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এমরান পোলট্রি অ্যান্ড ফিড ফার্মের মালিক মোহাম্মদ এমরান হোসেনের অভিযোগ, ফরহাদ হাসান তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত মাসিক চাঁদা দিতে বাধ্য করেন। এ ছাড়া গত ঈদুল আজহার সময় তাঁর খামার থেকে তিনটি গরু নিয়ে যাওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মোহাম্মদ এমরান হোসেন বলেন, “ওরা এসে বলে,আশিকুর রহমান মাহমুদের টাকা লাগবে। আমরা টাকা দিতে না চাইলে ওরা আমাদের মেরে ফেলার হুমকি দেয়।”

মেসার্স শামসুল ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক শামসুল আলমও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, “গত সপ্তাহে ফরহাদ ও তার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা আমার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে গেছে। তারা বলেছে, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদের জন্মদিনের জন্য এই টাকা লাগবে। তারা ছুরি নিয়ে এসেছিল। টাকা দেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না।”

কুমিল্লার আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নিট পণ্যের ব্যবসায়ী রবিউল আলম রবি, তালুকদার টিম্বারের মালিক আলী হোসেন তালুকদার, দুগ্ধ খামারের মালিক বাবুল হোসেন এবং প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ওমর ফারুক। এ ছাড়া নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী বিভিন্ন অভিযোগ জানিয়েছেন।

কুমিল্লা সদরের কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, অতীতে ফরহাদ হাসান আওয়ামী লীগ ও দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে সরকার পরিবর্তনের পর তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় অবস্থান পরিবর্তন করেছেন বলে তাঁদের দাবি।

এদিকে কুমিল্লার বাসিন্দা মো. আনিসুল ইসলাম হাবিবের দায়ের করা কুমিল্লার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর একটি মামলায় ফরহাদ হাসান ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ এবং কিশোর গ্যাংয়ের নেতার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, “আমি ফরহাদ হাসানকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি এবং আমি জানি, এসব অপরাধের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। ফরহাদ হাসান একজন সৎ ও পরিশ্রমী তরুণ। আমরা আশা করি, খুব শিগগিরই তাকে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দেখতে পাব।”

আশিকুর রহমান মাহমুদের কাছে তাঁর ও ফরহাদ হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের চাপিয়ে দেওয়া সন্ত্রাসের শাসনের অবসান ঘটাতে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফরহাদ হাসান আমাদের একজন বিশ্বস্ত সমর্থক, যে এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের সাহায্য করেছে। দুঃখজনকভাবে, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা এখনো আমাদের দেশে রয়ে গেছে। তারা এসব মনগড়া কাহিনি তৈরি করে আমাদের মহৎ কাজের বিরোধিতা করছে। ইহকালে অথবা আখিরাতের ময়দানে তারা তাদের কর্মের ফল ভোগ করবে।”

অন্যদিকে, ফরহাদ হাসান তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বলেন, “আমার সম্পর্কে কে কী বলছে, তাতে কিছু যায় আসে না। আমি জানি আমার উদ্দেশ্য কী এবং আমার কাজ ও রাজনৈতিক জীবন মাত্র শুরু হয়েছে। মহান আল্লাহর রহমতে আমি সবকিছু কাটিয়ে উঠব এবং বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করব।”