ঢাকা: ক্ষমতায় এলে যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। তবে সরকার গঠনের চার মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা না যাওয়ায় বিএনপির শরিক দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ১২-দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট এবং গণতন্ত্র মঞ্চসহ ৩০টিরও বেশি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় ছিল। এসব দলের অনেক নেতা-কর্মী আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হন। ফলে নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তারা রাজনৈতিকভাবে মূল্যায়িত হবেন—এমন প্রত্যাশা ছিল শরিকদের মধ্যে।
যদিও সরকার গঠনের পর বিএনপি জোটসঙ্গীদের মধ্য থেকে দু’জনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছে, তবুও এটিকে কেউ জাতীয় সরকার হিসেবে দেখছেন না। বিএনপিও আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারকে জাতীয় সরকার বলে আখ্যা দেয়নি। বরং নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠন বা জোটসঙ্গীদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলে অভিযোগ শরিক দলগুলোর।
বিরোধী রাজনীতির সময় বিএনপি ও তাদের মিত্ররা সংসদ বিলুপ্তি, সরকারের পদত্যাগ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন চালায়। ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গোলাপবাগ মাঠে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় সমাবেশ থেকে বিএনপি ১০ দফা দাবি ঘোষণা করে এবং যুগপৎ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করে। সেই সময় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিরোধী দলগুলোকে একযোগে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
আন্দোলনের সময় বিএনপির সঙ্গে শরিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল বলে জানা যায়। এর মধ্যে ছিল নির্বাচনে আসন সমঝোতা এবং ক্ষমতায় গেলে জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি। শরিকদের দাবি, অন্তত ৫০টি সংসদীয় আসন ছাড় দেওয়ার কথা ছিল এবং সরকার গঠন করলে আন্দোলনের সঙ্গীদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, বিএনপি এখন আর জাতীয় সরকারের ধারণার মধ্যে নেই। তিনি বলেন, “জাতীয় সরকারের প্রস্তাব বিএনপিরই ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর গত চার মাসে আমাদের সঙ্গে বিএনপির কোনো রাজনৈতিক যোগাযোগ হয়নি। নির্বাচনের পর অন্তত একবার হলেও জোটসঙ্গীদের নিয়ে বৈঠক হতে পারত।”
তার মতে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয় লাভের পর বিএনপি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “বিএনপিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা এককভাবে রাজনীতি করবে, নাকি মিত্রদের নিয়ে এগোবে। বর্তমান অবস্থান প্রকারান্তরে শরিকদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে।”
সাইফুল হক আরও বলেন, সরকারে শরিকদের মধ্যে প্রকৃত অর্থে কেবল গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিই মূল্যায়িত হয়েছেন। অন্যদিকে নুরুল হক নূর বর্তমানে সরকারের অংশ হলেও তিনি যুগপৎ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অংশীদার ছিলেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপির শরিক বিকল্প ধারা বাংলাদেশের একাংশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারীও একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর বিএনপি তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করেনি। জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়নি। তবে তিনি এখনো আশাবাদী যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অথবা জোট সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান ভবিষ্যতে শরিকদের নিয়ে বৈঠকে বসবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলে থাকাকালে রাজনৈতিক দলগুলো যে ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থানের কথা বলে, ক্ষমতায় গেলে অনেক সময় সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। শরিকদের অভিযোগ, বিএনপির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তবে বিএনপির ভেতরের একটি অংশের দাবি, জাতীয় সরকার গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকাও রয়েছে। তাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জামায়াত স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে এবং বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। ফলে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের জন্য ১৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করা পাঁচটি দলের জন্য বরাদ্দ ছিল আটটি আসন। এসব আসন থেকে নির্বাচিত হন গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর। এছাড়া কয়েকজন শরিক নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন, যাদের মধ্যে ববি হাজ্জাজ ও শাহাদাত হোসেন সেলিম বিজয়ী হন।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৮ মার্চ লন্ডনে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথম জাতীয় সরকারের ধারণা তুলে ধরেন। তিনি বলেছিলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করা হবে এবং নির্বাচনে জয়ী হলে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। পরবর্তীকালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একই প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
কিন্তু সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন না ঘটায় শরিকদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যতে বিএনপি যদি জোটভিত্তিক রাজনীতি শক্তিশালী রাখতে চায়, তাহলে আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন হবে।