ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৫০:০৫ PM

স্বাদে গন্ধে নাজিরাবাজার:খাবারের রাজধানী

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
18-06-2026 08:26:50 PM
স্বাদে গন্ধে নাজিরাবাজার:খাবারের রাজধানী

পুরান ঢাকার খাবারের কথা উঠলেই যে কয়েকটি এলাকার নাম সবার আগে আসে, তার মধ্যে অন্যতম নাজিরাবাজার। দিনের বেলায় এটি একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা হলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো অঞ্চল যেন রূপ নেয় এক বিশাল খাদ্যপল্লিতে। কাবাবের ধোঁয়া, মসলার ঘ্রাণ, বিরিয়ানির সুবাস এবং মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে এর অলিগলি। বহু খাদ্যরসিকের কাছে নাজিরাবাজার শুধু একটি বাজার নয়, বরং পুরান ঢাকার খাদ্য ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এ কারণেই অনেকে একে ‘পুরান ঢাকার খাবারের রাজধানী’ বলেও অভিহিত করেন।

সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় চেহারা

বিকেল গড়াতেই কাজী আলাউদ্দিন রোড ও আশপাশের সড়কজুড়ে জমে ওঠে খাবারের দোকান। অফিস শেষে কর্মজীবী মানুষ, পরিবার, বন্ধুদের আড্ডা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা খাদ্যপ্রেমীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পায় পুরো এলাকা। রাত যত গভীর হয়, ভিড়ও তত বাড়তে থাকে।

নাজিরাবাজারের অন্যতম আকর্ষণ হলো এখানে একই সঙ্গে পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও, কাবাব, নেহারি, কালাভুনা, রেশমি কাবাব, আফগানি কাবাব, বটি কাবাবসহ নানা ধরনের শরবত ও লাচ্ছি। পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এসব খাবার দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

কাবাবের জন্য আলাদা খ্যাতি

নাজিরাবাজারের রাতের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কাবাব। সন্ধ্যার পর রাস্তার দুই পাশে সারি সারি চুল্লিতে কয়লার আগুনে ঝলসানো হয় বিভিন্ন ধরনের কাবাব। রেশমি, হারিয়ালি, আফগানি, টিক্কা ও বটি কাবাবের মনমুগ্ধকর সুবাস ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। এসব কাবাবের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় নান, পরোটা কিংবা লুচি।

খাদ্যরসিকদের মতে, পুরান ঢাকার অন্যান্য এলাকার তুলনায় নাজিরাবাজারের কাবাবে মসলার ব্যবহার ও প্রস্তুত প্রণালীর রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। অনেক দোকানে এখনো পুরোনো রেসিপি অনুসরণ করা হয়, যা খাবারের স্বাদকে দেয় অনন্য মাত্রা।

বিরিয়ানিরও শক্ত অবস্থান

কাবাবের পাশাপাশি বিরিয়ানির জন্যও সুপরিচিত নাজিরাবাজার। এলাকার জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে হানিফ বিরিয়ানি, হাজী বিরিয়ানি, হাজী নান্না বিরিয়ানি, মামুন বিরিয়ানি হাউজ, মতি বিরিয়ানি হাউজ এবং বোখারি বিরিয়ানি। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে খাবার খেতে কিংবা পার্সেল সংগ্রহ করতে ভিড় করেন।

অনেকেই রাতের খাবারে কাচ্চি বিরিয়ানি বা গরুর মাংসের বিরিয়ানি পছন্দ করেন। আবার কেউ কেউ কাবাবের সঙ্গে পরোটা কিংবা নান খেতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

খাবারের সঙ্গে আড্ডার সংস্কৃতি

নাজিরাবাজার শুধু খাবারের স্থান নয়; এটি আড্ডারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রাত গভীর হলেও এখানে মানুষের উপস্থিতি কমে না। বন্ধুদের দল, পরিবার কিংবা বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীরা খাবারের টেবিলে গল্প-আড্ডায় মেতে থাকেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক মানুষ শুধু খাবারের স্বাদ নিতে নয়, পুরান ঢাকার রাতের পরিবেশ উপভোগ করতেও এখানে আসেন। সরু রাস্তা, পুরোনো ভবন এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় এক ভিন্ন আবহ।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে ব্যবসা

নাজিরাবাজারের অনেক খাবারের দোকান কয়েক দশক ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। পরিবারের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে ব্যবসার দায়িত্ব হস্তান্তর হয়েছে। ফলে পুরোনো স্বাদ ও ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টা এখনো দৃশ্যমান।

খাবার ব্যবসায়ীরা জানান, পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য তারা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো পদ্ধতিতে রান্না করেন। বিশেষ করে কাবাব ও বিরিয়ানির ক্ষেত্রে মসলা তৈরির নিজস্ব রেসিপি ও কৌশল অনুসরণ করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ভ্রমণ ও খাদ্যবিষয়ক আলোচনায় নাজিরাবাজারকে পুরান ঢাকার অন্যতম অবশ্য-দর্শন খাদ্যগন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনেক খাদ্যরসিক বিশেষভাবে হারিয়ালি কাবাব, শিক কাবাব, লাচ্ছি, ফালুদা ও মাঠার প্রশংসা করেন।

ভিড় ও যানজটের মাঝেও জনপ্রিয়

জনপ্রিয়তার কারণে নাজিরাবাজারে যানজট, পার্কিং সংকট এবং অতিরিক্ত ভিড় প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বিশেষ করে ছুটির দিন ও উৎসবের সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তবে এসব অসুবিধা সত্ত্বেও খাবারের টানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে ছুটে আসেন।

ব্যবসায়ী মো. কামরুল হোসেন বলেন, “নাজিরাবাজারের খাবারের সুনাম আজকের নয়, বহু বছরের। আমার বাবা এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন, এখন আমি পরিচালনা করছি। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় থাকে। শুধু ঢাকার বিভিন্ন এলাকা নয়, দেশের বাইর থেকেও অনেক মানুষ পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে আসেন। আমরা চেষ্টা করি পুরোনো রেসিপি ও স্বাদ অক্ষুণ্ন রাখতে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।”

ক্রেতা মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, “আমি মিরপুরে থাকি। কিন্তু মাসে অন্তত দুই-তিনবার বন্ধুদের নিয়ে নাজিরাবাজারে আসি। এখানকার কাবাব আর বিরিয়ানির স্বাদ অন্য জায়গার তুলনায় আলাদা। বিশেষ করে কয়লার আগুনে তৈরি কাবাবের ঘ্রাণ ও স্বাদ আমাকে বারবার টেনে আনে। ভিড় ও যানজট থাকলেও খাবারের জন্য সেই কষ্ট মেনে নেওয়া যায়।”

আরেক ক্রেতা নুসরাত জাহান বলেন, “পরিবার নিয়ে প্রথমবার নাজিরাবাজারে এসেছিলাম কয়েক বছর আগে। এরপর থেকে সুযোগ পেলেই চলে আসি। এখানে শুধু খাবার নয়, পুরান ঢাকার পরিবেশটাও উপভোগ করি। রাতের আলো, মানুষের কোলাহল আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন ফাস্টফুডের দিকে ঝুঁকছে, কিন্তু নাজিরাবাজারের খাবার আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বাদ মনে করিয়ে দেয়।”

ঐতিহ্যের স্বাদে বেঁচে আছে নাজিরাবাজার

আধুনিক ঢাকায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রেস্তোরাঁ গড়ে উঠলেও নাজিরাবাজারের আবেদন এতটুকুও কমেনি। বরং পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতির অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী এলাকা হিসেবে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কাবাবের ধোঁয়া, বিরিয়ানির সুবাস, রাতজাগা মানুষের ভিড় এবং দীর্ঘদিনের খাদ্যঐতিহ্যের সমন্বয়ে নাজিরাবাজার আজও রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় রাতের খাবারের গন্তব্য।

খাদ্যরসিকদের কাছে তাই নাজিরাবাজার শুধুই একটি বাজার নয়; এটি পুরান ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্বাদের এক অনন্য মিলনস্থল।