ঢাকা, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:১৫:৪২ AM

সোহেলির শেষ যাত্রা:এক শহরের নির্মম মুখ

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
13-06-2026 06:00:00 AM
সোহেলির শেষ যাত্রা:এক শহরের নির্মম মুখ

স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর প্রায় দেড় দশক ধরে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন সোহেলি ইসলাম। প্রতিদিনের সংগ্রাম, দায়িত্ব আর স্বপ্নের ভেতর দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিল তার জীবন। কিন্তু সেই জীবন থেমে গেল রাজধানীর এক ভোরবেলার ছিনতাইকারীর হামলায়। একটি ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, কিছু মুহূর্তের টানাহেঁচড়া, তারপর চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে যাওয়া— আর সেই ঘটনাই কেড়ে নিল এক সংগ্রামী মায়ের জীবন।

সোহেলি ইসলাম (৪২) ছিলেন একটি ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল সার্ভিস অফিসার। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার সাহেবপাড়া এলাকায়। কর্মসূত্রে তিনি ঢাকার ধানমন্ডি-গ্রিনরোড এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কখনো হার মানেননি। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর একমাত্র মেয়ে সুমাইয়া আলমকে মানুষ করাই ছিল তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য।

কয়েক দিন আগে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মেয়েকে নিয়ে পার্বতীপুরে গিয়েছিলেন সোহেলি। অনুষ্ঠান শেষে গত ৬ জুন রাত ৯টার বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন মা ও মেয়ে। দীর্ঘ রাতের যাত্রা শেষে ৭ জুন ভোর ৫টার দিকে তারা গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছান। তখনও চারপাশ পুরোপুরি আলোকিত হয়নি। তাই কিছুক্ষণ বাস কাউন্টারে অপেক্ষা করেন তারা।

ভোর সাড়ে ৬টার দিকে আলো ফোটার পর একটি রিকশায় করে বাসার উদ্দেশে রওনা হন সোহেলি ও তার মেয়ে। হয়তো তখন তাদের চিন্তায় ছিল বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নেওয়া, নতুন সপ্তাহের প্রস্তুতি কিংবা ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সবকিছু বদলে যায়।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে পৌঁছানোর পর মোটরসাইকেলযোগে আসা কয়েকজন ছিনতাইকারী সোহেলির হাতে প্যাঁচানো ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ব্যাগটি শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। শুরু হয় টানাহেঁচড়া। একপর্যায়ে ভারসাম্য হারিয়ে চলন্ত রিকশা থেকে সড়কে পড়ে যান সোহেলি।

মাথার পেছনের অংশে গুরুতর আঘাত লাগে। ফেটে যায় মাথা। রক্তে ভিজে যায় রাস্তা। আর সেই ভয়াবহ দৃশ্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিল তার একমাত্র মেয়ে।

কল্পনা করা যায়, সেই মুহূর্তে মেয়েটির কী অবস্থা ছিল? কয়েক সেকেন্ড আগেও যে মা পাশে বসে ছিলেন, হঠাৎ তাকেই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা— এটি কোনো সন্তানের জন্যই সহ্য করা সহজ নয়। হয়তো সে মায়ের মাথা কোলে তুলে ধরে বারবার বলছিল, “মা, কিছু হবে না। তুমি ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি নির্মম।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, আহত হওয়ার পর সোহেলি আশপাশের মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু শুরুতে কেউ এগিয়ে আসেননি। পরে রিকশাচালক এবং আরেকজনের সহায়তায় তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে দ্রুত স্থানান্তর করা হয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

মাথায় গুরুতর আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার অবস্থা ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন তিনি। শুধু যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিলেন। চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সোহেলির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, সমাজের জন্যও এক গভীর বেদনার নাম। কারণ এই মৃত্যুর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের এক জীবনকাহিনি।

প্রায় দেড় দশক আগে তার বৈবাহিক সম্পর্কের ইতি ঘটে। এরপর থেকে একাই মেয়েকে বড় করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি। চাকরি করেছেন, সংসার সামলেছেন, মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করেছেন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি ছিলেন এক যোদ্ধা।

কিন্তু ভাগ্য যেন তার প্রতি খুব একটা সহানুভূতিশীল ছিল না।

দুই বছর আগে তিনি হারান তার বাবাকে। বাবার মৃত্যুর মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে মারা যান তার মা-ও। সেই শোক কাটিয়ে আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। কারণ তার সামনে ছিল একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ।

আজ সেই মেয়েটিই সবচেয়ে বড় শূন্যতার মুখোমুখি।

সুমাইয়া আলম বর্তমানে বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এতদিন যার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তার মা, সেই মানুষটিই আজ আর নেই। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মায়ের স্নেহ, ত্যাগ আর সংগ্রামই ছিল তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। এখন তাকে জীবনযুদ্ধের নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে মাকে ছাড়া।

সোহেলির মৃত্যুর পর তার মরদেহ নেওয়া হয় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পশ্চিম টেংরী গ্রামে, তার নানাবাড়িতে। সেখানেই সম্পন্ন হয় তার দাফন।

এদিকে ঘটনার পরও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের ভাষ্য, শোকাহত পরিবারের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— যদি ঘটনাটি শুরুতেই ব্যাপক আলোচনায় আসত, তাহলে কি তদন্ত আরও দ্রুত হতো? অপরাধীরা কি আগেই শনাক্ত হতো?

আমাদের শহরগুলো আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতার ভেতর দিয়ে চলাফেরা করেন। কেউ কর্মস্থলে যান, কেউ সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন, কেউ স্বপ্ন নিয়ে নতুন দিন শুরু করেন। কিন্তু কখন, কোথায়, কীভাবে অপরাধের শিকার হতে হবে— তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সোহেলি ইসলামের মৃত্যু কেবল একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়। এটি একজন মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প। এটি একজন মেয়ের চোখের সামনে মাকে হারানোর গল্প। এটি সেইসব মানুষের গল্প, যারা প্রতিদিন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকেন, কিন্তু কখনো কখনো অপরাধ ও অব্যবস্থার কাছে পরাজিত হন।

একটি ভ্যানিটি ব্যাগের মূল্য কত? কয়েকশো, হয়তো কয়েক হাজার টাকা। কিন্তু সেই ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে গিয়ে নিভে গেল একটি জীবন, ভেঙে গেল একটি পরিবারের পৃথিবী, অনাথ হয়ে গেল এক সন্তানের স্বপ্ন।

সোহেলি আর ফিরবেন না। কিন্তু তার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়— একটি নিরাপদ শহর শুধু উন্নয়ন আর উঁচু ভবনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে মানুষের নিরাপত্তা, মানবিকতা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে।

যতদিন সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত না হবে, ততদিন হয়তো আরেকজন সোহেলি, আরেকটি পরিবার, আরেকটি স্বপ্ন একইভাবে হারিয়ে যাবে কোনো এক ভোরবেলার অন্ধকারে।