ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৪৯:৫১ PM

পরীমনি-কাণ্ডে সাবেক এডিসি সাকলায়েনকে অবসর

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
18-06-2026 08:18:50 PM
পরীমনি-কাণ্ডে সাবেক এডিসি সাকলায়েনকে অবসর

চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) এবং বর্তমানে ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষে তার বিরুদ্ধে আনা ‘অসদাচরণ’-সংক্রান্ত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার (১৬ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা অনুবিভাগ) কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে বিবেচনাধীন রয়েছে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৩ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে উপসচিব রোকেয়া পারভীন জুঁই স্বাক্ষরিত এক স্মারকে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাছে সাকলায়েনকে ‘গুরুদণ্ড’ হিসেবে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়।

স্মারকে উল্লেখ করা হয়, মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য তদন্তে বিভিন্ন সময়ে দিন ও রাতে পরীমনির বাসভবনে সাকলায়েনের অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের জুনে। সে সময় ঢাকার অদূরে সাভারের বিরুলিয়া বোট ক্লাবে চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় তিনি ধর্ষণচেষ্টা ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। মামলার পরদিন প্রধান আসামি হিসেবে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে পরীমনিকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। সেখানেই ডিবির গুলশান বিভাগের তৎকালীন এডিসি গোলাম সাকলায়েনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে ওঠে এবং বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে পরীমনির সঙ্গে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন সাকলায়েন। তিনি বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক হওয়া সত্ত্বেও পরীমনির সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বলে তদন্তে প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, পরীমনির সঙ্গে জন্মদিন উদযাপন, তার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত এবং নিজের সরকারি বাসভবনে স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সময় কাটানোর মতো ঘটনা তদন্তে উঠে এসেছে। এমনকি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দুজন একসঙ্গে অবস্থান করেছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

সরকারি তদন্তে বলা হয়, এ ধরনের আচরণ একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অসদাচরণের শামিল। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ ঘটনার পর সাকলায়েনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগের জবাবে তিনি লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন এবং ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন জানান। তদন্ত পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হায়াত-উদ-দৌলা খাঁনকে।

তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এরপর কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, সে বিষয়ে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। জবাবে তিনি দায়মুক্তির আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ তা সন্তোষজনক মনে করেনি।

পরবর্তীতে তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের মতামত চাওয়া হয়। কমিশনের পরামর্শ ও বিভাগীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর চূড়ান্তভাবে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে পরীমনির সঙ্গে একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শোবিজ অঙ্গন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। তখন থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। দীর্ঘ তদন্ত ও বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে সেই পরিণতিই ঘটল।