ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:০৯:০১ AM

গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাচ্ছে সংসদ সদস্যদের

মান্নান মারুফ
17-06-2026 08:34:57 PM
গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাচ্ছে সংসদ সদস্যদের

দলীয় পরিচিতি, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই দেশের অধিকাংশ সংসদ সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের সময় তারা নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন করেন। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় অনেক সংসদ সদস্যের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের কাছেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাচ্ছে বলে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার একাধিক সংসদ সদস্য, স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন সংসদ সদস্যের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার অন্যতম প্রধান উপায় হলো নির্বাচনী এলাকায় দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। জনগণ সাধারণত তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করে এলাকার উন্নয়ন, জনসেবামূলক উদ্যোগ এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার ভিত্তিতে। নির্বাচনের পর যদি কোনো সংসদ সদস্য এলাকায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে ব্যর্থ হন, তাহলে জনগণের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়াই স্বাভাবিক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অতীতে সংসদ সদস্যদের জন্য বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন বরাদ্দের ব্যবস্থা ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, সামাজিক অবকাঠামো, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিভিন্ন প্রকল্পে থোক বরাদ্দ দেওয়া হতো। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির ও প্যাগোডার উন্নয়ন প্রকল্পে সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা থাকত। এসব বরাদ্দের মাধ্যমে তারা স্থানীয় জনগণের বিভিন্ন চাহিদা পূরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারতেন এবং জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হতো।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক সংসদ সদস্য অভিযোগ করছেন যে, সরকার গঠনের পর গত কয়েক মাসে তারা উন্নয়নমূলক কাজের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো বরাদ্দ পাননি। ফলে নির্বাচনী এলাকায় নতুন কোনো প্রকল্প গ্রহণ কিংবা ছোটখাটো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হচ্ছে।

বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীরা জানান, নির্বাচনের সময় জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে এখন তারা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি নিয়ে সংসদ সদস্যদের কাছে আসছেন। কেউ রাস্তা সংস্কারের দাবি করছেন, কেউ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন চাইছেন, আবার কেউ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণের অনুরোধ জানাচ্ছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরকারি বরাদ্দ না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব দাবি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

অনেক এলাকায় দেখা গেছে, নির্বাচনের পর জনগণের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের যোগাযোগ থাকলেও কার্যকর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের অভাবে সেই সম্পর্ক আগের মতো দৃঢ় থাকছে না। জনগণ দৃশ্যমান কাজ দেখতে চায়। কোনো এলাকায় নতুন রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অসন্তোষ দীর্ঘমেয়াদে জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

একাধিক সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, নতুন নির্বাচিত অনেক সংসদ সদস্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কেও পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ নন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়, প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি এবং বাজেট বরাদ্দ সংগ্রহের বিষয়ে তাদের অনেকেরই বাস্তব অভিজ্ঞতা কম। ফলে সরকারি সহায়তা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা ছাড়া কার্যকর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে। অতীতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নেতাকর্মীরা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পেতেন। কিন্তু বর্তমানে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ায় সেই সুযোগও কমে গেছে। অনেক কর্মী অভিযোগ করছেন, এখন সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল আনুষ্ঠানিক বৈঠক কিংবা সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এলাকায় কোনো প্রকল্প না থাকায় নেতাকর্মীরাও জনগণের কাছে নিজেদের কার্যকারিতা তুলে ধরতে পারছেন না।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির তুলনায় বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। তারা আশা করেছিলেন নির্বাচনের পরপরই বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক এলাকায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে জনপ্রতিনিধিদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নিচ্ছে।

সংসদ সদস্যরা সরকারি ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেলেও তাদের অনেকের মতে, এসব অর্থ মূলত ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক ব্যয় নির্বাহের জন্যই যথেষ্ট। বৃহৎ পরিসরে জনকল্যাণমূলক বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ফলে তারা মনে করছেন, নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে বিশেষ থোক বরাদ্দ বা পৃথক উন্নয়ন তহবিলের প্রয়োজন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্যদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ পুনর্বহাল করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান, ছোট ও মাঝারি আকারের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন সহজ হবে। একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে এবং তাদের প্রতি মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।

তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত বা কার্যকর উদ্যোগের কথা জানা যায়নি। ফলে অনেক সংসদ সদস্য অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় পার করছেন। তাদের প্রত্যাশা, সরকার শিগগিরই নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমকে গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও নীতিগত সহায়তার ব্যবস্থা করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন জনপ্রতিনিধির সফলতা নির্ভর করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের সক্ষমতার ওপর। আর সেই সক্ষমতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং বাস্তবমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা না গেলে জনগণের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।

তাই সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে সংসদ সদস্যদের জন্য একটি কার্যকর উন্নয়ন সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। অন্যথায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্থবিরতা শুধু জনপ্রতিনিধিদের জনপ্রিয়তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের আস্থা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।