ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৫১:৫৩ PM

কর বৃদ্ধিতেও কমছে না ধূমপান

ষ্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
16-06-2026 08:42:45 PM
কর বৃদ্ধিতেও কমছে না ধূমপান

দেশে তামাকজাত পণ্যের ওপর ধারাবাহিকভাবে কর ও মূল্য বৃদ্ধি করা হলেও তরুণদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। বরং অনেক তরুণ ধূমপায়ী দামি ব্র্যান্ড ছেড়ে কম দামের সিগারেট বেছে নিচ্ছেন কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে ধূমপানের অভ্যাস বজায় রাখছেন। একই সঙ্গে ই-সিগারেট বা ভেপিংয়ের ব্যবহারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা আব্দুল হালিম (৩৬) দীর্ঘদিনের চেইন স্মোকার। আগে প্রতিদিন এক প্যাকেট (২০টি) বেনসন সিগারেট খেতেন। তবে গত দুই বছরে সিগারেটের দাম বাড়ার পর তিনি ধূমপানের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭টি সিগারেট সেবন করেন।

অন্যদিকে সতীন্দ্রনাথ (৪০) প্রতিদিন প্রায় দেড় প্যাকেট বেনসন সিগারেট খেতেন। ২০২২ সালের পর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি প্রথমে গোল্ডলিফ এবং পরে আরও কম দামের ওরিস ব্র্যান্ডে চলে যান। রাজধানীর আরেক বাসিন্দা সাব্বির আহমেদ (৩৮) জানান, তিনি তুলনামূলকভাবে কম ধূমপান করলেও মূল্যবৃদ্ধির কারণে আরও কিছুটা কমিয়েছেন।

তবে অনেকের মতে, ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। বেসরকারি চাকরিজীবী রফিক মৃধা বলেন, ধীরে ধীরে ১-২ টাকা করে দাম বাড়ানোর ফলে ধূমপায়ীরা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন। কার্যকর ফল পেতে হলে একবারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি ‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট’ পরিচালিত “তামাক কর বৃদ্ধির ফলে তরুণ ধূমপায়ীদের ওপর প্রভাব: প্রয়োজন শক্তিশালী তামাক কর নীতি” শীর্ষক গবেষণায় এ ধরনের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। দেশের আটটি বিভাগের ৩৯১ জন তরুণ ধূমপায়ীর (বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছর) ওপর পরিচালিত গবেষণায় ধূমপানের আচরণগত ও সামাজিক বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়।

দাম বাড়লেও ধূমপান ছাড়েনি অধিকাংশ তরুণ

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, তামাকজাত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পর মাত্র ২০ দশমিক ৭২ শতাংশ তরুণ ধূমপানের পরিমাণ কমিয়েছেন। বিপরীতে ৭৯ দশমিক ২৮ শতাংশ তরুণের আচরণে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। এর মধ্যে ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণের ধূমপানের মাত্রা অপরিবর্তিত রয়েছে এবং ৩ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে।

ধূমপানের অভ্যাস বজায় রাখতে অনেকেই ব্র্যান্ড পরিবর্তনের পথ বেছে নিয়েছেন। গবেষণায় দেখা যায়, ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ তরুণ সরাসরি কম দামের ব্র্যান্ডে স্থানান্তরিত হয়েছেন এবং ৫৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ তরুণ মাঝে-মধ্যে সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেট ব্যবহার করছেন।

প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়েও কেনা হচ্ছে সিগারেট

গবেষণার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো ধূমপানের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। তামাক কর বৃদ্ধির পর ১৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ তরুণ ধূমপানের খরচ মেটাতে তাদের দৈনন্দিন ব্যয় সংকুচিত করেছেন।

এদের মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশ খাদ্য, যাতায়াত, যোগাযোগ ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের ব্যয় কমিয়েছেন। এছাড়া ২৩ শতাংশ তরুণ পারিবারিক বাজেট থেকে অর্থ সাশ্রয় করে সিগারেট কিনছেন। অল্পসংখ্যক তরুণ পড়াশোনা বা বিনোদনের খরচ কমিয়েও ধূমপানের জন্য অর্থ জোগাড় করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আসক্তির গভীরতা এবং তরুণদের জীবনযাত্রায় এর নেতিবাচক প্রভাবের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।

নতুন উদ্বেগ: ই-সিগারেট ও ভেপিং

গবেষণায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হিসেবে উঠে এসেছে ই-সিগারেট বা ভেপিংয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। ২০১৭ সালের গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (জিএটিএস) অনুযায়ী দেশে ই-সিগারেট ব্যবহারকারীর হার ছিল মাত্র ০.২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের এই গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী তরুণদের মধ্যে ভেপিং ব্যবহারকারীর হার বেড়ে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক কোম্পানিগুলোর আক্রমণাত্মক বিপণন কৌশল এবং বিভিন্ন সুগন্ধিযুক্ত পণ্যের আকর্ষণে তরুণরা দ্রুত ই-সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ তরুণ সিগারেটের পাশাপাশি জর্দা ও গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকও ব্যবহার করছেন।

এমআরপি লঙ্ঘন ও রাজস্ব ক্ষতি

গবেষণায় দেখা গেছে, ৭২ দশমিক ৩৮ শতাংশ তরুণ ধূমপায়ী বাজারে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) অপেক্ষা বেশি দামে খুচরা সিগারেট কিনছেন। অন্যদিকে ২৬ শতাংশ তরুণ এমআরপি সম্পর্কে অবগত নন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর কাঠামোর জটিলতা এবং খুচরা শলাকা বিক্রির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। ফলে সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতির কার্যকারিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য সচেতনতাই ধূমপান কমানোর প্রধান কারণ

যে ২০ দশমিক ৭২ শতাংশ তরুণ ধূমপানের পরিমাণ কমিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৪১ দশমিক ৯৯ শতাংশ স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে সচেতন হওয়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এছাড়া ২৩ দশমিক ৮১ শতাংশ পাবলিক প্লেসে ধূমপানের সুযোগ সীমিত হওয়ায়, ১৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ আগ্রহ বা আসক্তি কমে যাওয়ার কারণে এবং ১৪ দশমিক ৩২ শতাংশ অর্থনৈতিক চাপে ধূমপান কমিয়েছেন।

এ থেকে বোঝা যায়, মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা ধূমপান হ্রাসে তুলনামূলক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, সাধারণত কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তার চাহিদা কমে। তবে তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। কারণ এটি একটি আসক্তিকর পণ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকের দাম ১০ শতাংশ বাড়লেও উন্নয়নশীল দেশে এর চাহিদা গড়ে মাত্র ৬ শতাংশ কমে।

তার মতে, তরুণদের ধূমপান থেকে দূরে রাখতে করনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তামাকজাত পণ্যের মূল্য এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে তা তরুণদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা কমবে।

অন্যদিকে ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, শুধু কর বৃদ্ধি করে ধূমপান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর আইন এবং কার্যকর প্রয়োগ। বিশেষ করে উন্মুক্ত স্থান, গণপরিবহন, পার্ক ও রেস্তোরাঁয় ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা গেলে ধূমপানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

সুপারিশ

গবেষণায় তামাক নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিগারেটের স্তরভিত্তিক কর কাঠামো বাতিল করে সহজ ও শক্তিশালী কর ব্যবস্থা চালু করা, খুচরা শলাকা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, এমআরপি কঠোরভাবে তদারকি করা, ই-সিগারেট ও ভেপিং নিষিদ্ধ করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলে তামাকবিরোধী প্রচারণা জোরদার করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর বৃদ্ধি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা—এই তিনটি পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা এবং তামাকমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।