দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন দেড় শতাধিক ত্যাগী নেতা। দীর্ঘদিন ধরে কোনো পদ-পদবী না থাকলেও তারা দল ছাড়েননি। একসময় মাঠ কাঁপানো এসব নেতা আজ সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই উপেক্ষিত। তবুও বিএনপির প্রতি তাদের আনুগত্য ও ভালোবাসায় কোনো ভাটা পড়েনি। তারা বিশ্বাস করেন, দলের জন্য তাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ, সংগ্রাম ও অবদান একদিন যথাযথ মূল্যায়ন পাবে। সেই বিশ্বাস থেকেই পদ-পদবীর হিসাব না কষে এখনও তারা দলের কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন। দলই তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, দলই তাদের আশা-ভরসার শেষ ঠিকানা।
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির ইতিহাসে আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ এবং নির্যাতনের দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থেকে দলটি নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে পথচলা অব্যাহত রেখেছে। এই কঠিন সময়ে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন—ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং মহিলা দলের অসংখ্য নেতা-কর্মী রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। অনেকে ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, পেশা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিয়ে দলের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছেন।
তাদের মধ্যে অনেকেই বছরের পর বছর কারাবরণ করেছেন, আত্মগোপনে থেকেছেন, আদালতপাড়ায় দিনের পর দিন সময় কাটিয়েছেন এবং রাজনৈতিক মামলার বোঝা কাঁধে নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আজ তাদের অনেকেই দলীয় কোনো পদ-পদবীতে নেই। তবুও তারা বিএনপির রাজনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেননি। বরং দলকে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করার প্রত্যয়ে এখনও মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতার সংখ্যা দেড় শতাধিক বলে জানা যায়। এদের অধিকাংশই একসময় ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়গুলোতে যাদের নেতৃত্বে কর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছেন, যাদের আহ্বানে রাজপথ মুখরিত হয়েছে, আজ তাদের অনেকেই পরিচিত শুধুমাত্র “সাবেক নেতা” পরিচয়ে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী নেতাদের মধ্যে অন্যতম হলেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মরতাজুল করিম বাদরু। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন।
এছাড়া যুবদলের সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক টিম লিডার আবদুল খালেক হাওলাদার ছাত্র ও যুব রাজনীতির পরিচিত মুখ। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দুইবারের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি অসংখ্য কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন।
গোলাম মাওলা শাহিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি,পর পর দুইবার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। বর্তমানে কোন পদে না থাকলেও তার দলের প্রতি ভালবাসা কমেনি একটুও। গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে দলের নেতা তারেক রহমানের প্রতিও। রয়েছে এই নেতার অনেক মামলা । খেটেছে জেলও কিন্তু জিয়াউর রহমানের আর্দশ থেকে বিচ্যুৎ হননি তিনি।
যুবদলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আরও অনেক নেতা বর্তমানে কোনো সাংগঠনিক পদে নেই। তাদের মধ্যে রয়েছেন খুলনা বিভাগের সাংগঠনিক টিম লিডার আলী আকবর চুন্নু, চট্টগ্রাম বিভাগের টিম লিডার ইউসুফ বিন জলিল কালু, রাজশাহী বিভাগের টিম লিডার গোলাম রাব্বানী, ঢাকা মহানগর যুবদলের টিম লিডার তরিকুল ইসলাম বনি, ফরিদপুর বিভাগের টিম লিডার অ্যাডভোকেট আবু সেলিম চৌধুরী, সিলেট বিভাগের টিম লিডার শহীদ উল্লাহ তালুকদার, রংপুর বিভাগের টিম লিডার রুহুল আমিন আকিল, কুমিল্লা বিভাগের টিম লিডার জাকির হোসেন সিদ্দিকী এবং ঢাকা বিভাগের টিম লিডার জাকির হোসেন নান্নু।
একইভাবে যুবদলের সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান মাসুদ, জি. এম. সবুর কামরুল এবং মাসুদ আহমেদ মিলনও বিএনপির দুর্দিনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। নুরুল ইসলাম খান মাসুদ কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহ-সভাপতি সরোয়ার হোসেন এবং ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলসহ আরও প্রায় দেড় শতাধিক সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা বর্তমানে কোনো পদে না থাকলেও বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
তাদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তারা প্রতিকূলতার মধ্যেও দল ত্যাগ করেননি। বহু নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে অসংখ্য রাজনৈতিক মামলা। কারও বিরুদ্ধে কয়েক ডজন, আবার কারও বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দীর্ঘ সময় নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে না পারা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে জীবনযাপন এবং আদালতে মামলার তারিখে তারিখে হাজিরা দেওয়া—এসবই ছিল তাদের রাজনৈতিক জীবনের বাস্তবতা।
অনেক নেতা জানান, এমন সময়ও গেছে যখন মাসের পর মাস তারা নিজ ঘরে ঘুমাতে পারেননি। রাজনৈতিক কারণে পালিয়ে থাকতে হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। কারাগারে কাটাতে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এসব কারণে অনেকের পেশাগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং পারিবারিক জীবনেও নেমে এসেছে নানা জটিলতা।
তবে এসব নেতার অধিকাংশই মনে করেন, তাদের সংগ্রাম বৃথা যায়নি। কারণ তারা বিশ্বাস করেন, একটি রাজনৈতিক আদর্শ ও দলের জন্য ত্যাগ কখনও মূল্যহীন হয় না। সেই বিশ্বাস থেকেই তারা এখনও বিএনপির প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এবং দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখছেন।
দীর্ঘদিন পদ-পদবী না থাকায় অনেকের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে—এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। যারা একসময় কেন্দ্রীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ ছিলেন, যাদের নেতৃত্বে হাজারো কর্মী মাঠে নামতেন, তাদের অনেকেই এখন আগের মতো গুরুত্ব পান না বলে মনে করেন। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের উপস্থিতি থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তারা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।
এ অবস্থায় কেউ কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আবার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চাপ, মামলা এবং অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারপরও তারা দল থেকে দূরে সরে যাননি।
বরং তাদের বক্তব্য, বিএনপি তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি। দলটি কঠিন সময়ে তাদের পাশে ছিল, আর তারা নিজেদের রাজনৈতিক জীবন উৎসর্গ করেছেন বিএনপির আদর্শ ও দর্শনের প্রতি বিশ্বাস রেখে। সে কারণেই পদ-পদবী না থাকলেও তারা দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন।
এসব নেতার একটি বড় অংশ বিশ্বাস করেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ত্যাগী নেতা-কর্মীদের অবদান সম্পর্কে অবগত আছেন। তারা মনে করেন, দলের জন্য যারা দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছেন, তাদের মূল্যায়নের সময় একদিন অবশ্যই আসবে। সে প্রত্যাশা থেকেই তারা ধৈর্য ধরে কাজ করে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নেতৃত্ব যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা—এসব গুণের কারণে এসব নেতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে দল আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তাদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা এবং সাংগঠনিক কাঠামোয় তাদের জন্য উপযুক্ত জায়গা তৈরি করা। এতে শুধু নেতাদের মনোবলই বৃদ্ধি পাবে না, বরং দলের সাংগঠনিক ভিত্তিও আরও সুদৃঢ় হবে।
বিএনপির এই পদহীন কিন্তু সক্রিয় নেতারা আজও দল ছাড়ার কথা ভাবেন না। ব্যক্তিগত প্রাপ্তি, সুযোগ-সুবিধা কিংবা পদ-পদবীর হিসাব না কষে তারা দলের পতাকাতলে অবিচল রয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা—দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ত্যাগ, সংগ্রাম ও অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি একদিন মিলবে।
রাজনীতির বাস্তবতায় পদ-পদবী পরিবর্তনশীল। কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস কখনও হারিয়ে যায় না। বিএনপির এই ত্যাগী নেতারাই সেই ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। তারা এখনও দলকে শক্তিশালী করার স্বপ্ন দেখেন, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত রাখেন।
অপেক্ষা শুধু একটি বিষয়ের—দলের জন্য নিবেদিত এই ত্যাগী নেতৃত্বের অবদান কবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে। সেই উত্তরই হয়তো ভবিষ্যতের বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।