ঢাকা, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:৩০:০৫ AM

হাজারও ব্যক্তির আয়-ব্যয়ের হিসাব তদন্তের প্রস্তুতি

মান্নান মারুফ
19-06-2026 08:50:23 PM
হাজারও ব্যক্তির আয়-ব্যয়ের হিসাব তদন্তের প্রস্তুতি

ঢাকা: ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন পেশার কিছু ব্যক্তি অস্বাভাবিকভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে রাজনীতিবিদ, আমলা, রাজনৈতিক কর্মী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আয়-ব্যয়ের উৎস খতিয়ে দেখতে একটি বৃহৎ পরিসরের তদন্ত কার্যক্রমের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ইতোমধ্যে কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন অভিযোগ এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সম্ভাব্য তদন্তযোগ্য ব্যক্তিদের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছে। ওই তালিকায় প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তির আর্থিক কর্মকাণ্ড, সম্পদ অর্জনের উৎস এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

সূত্র জানায়, বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন ঘটে, তার সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি অনিয়ম, প্রভাব খাটানো, চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা অন্যান্য অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করেছেন—এমন অভিযোগ বিভিন্ন পর্যায় থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যেই সম্ভাব্য তদন্ত কার্যক্রমের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেসব ব্যক্তির পরিচিত আয়ের উৎস সীমিত ছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। জমি, ফ্ল্যাট, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্পদের উৎস যাচাই করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অভিযোগের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক যাচাইয়ের কাজও শুরু করেছে বলে সূত্রের দাবি।

এদিকে বর্তমান সরকার দুর্নীতি, অবৈধ অর্থ উপার্জন, চাঁদাবাজি এবং দখলবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক বক্তব্যেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির কথা উঠে এসেছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা নির্বিশেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল ধারণা করছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য তদন্তের আওতায় আসা ব্যক্তিদের মধ্যে শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীই নন, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও থাকতে পারেন। তবে তদন্তের তালিকায় কারা রয়েছেন কিংবা কোন সংস্থা কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করেছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাযায় নি।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন সংস্থার কাছে জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, চাঁদা আদায়, জোরপূর্বক সম্পত্তি দখল এবং বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের বিষয়। এসব অভিযোগের মধ্যে কোনগুলো সত্য এবং কোনগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—তা নির্ধারণের জন্য বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে যথাযথ তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তি হঠাৎ সম্পদের মালিক হয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠলেই তাকে দোষী বলা যায় না। সম্পদের বৈধ উৎস, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য কারণও থাকতে পারে। তাই নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সম্ভাব্য তদন্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা থাকলেও দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা বলছেন, যেকোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে মন্তব্য করা সমীচীন নয়।

সূত্র আরও জানায়, তদন্তের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদের বিবরণী, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য পর্যালোচনা করা হতে পারে। প্রয়োজনে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমেও তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এর মাধ্যমে সম্পদের প্রকৃত উৎস নির্ধারণ এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত রাষ্ট্রের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগকে অবশ্যই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মত হতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তির আয়-ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখার সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবুও অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রস্তুতি চলছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। তবে তদন্ত সম্পন্ন হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসা পর্যন্ত এসব তথ্যকে প্রাথমিক পর্যায়ের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।