ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০২:১৫:০১ PM

চট্টগ্রাম–কুনমিং সড়ক, সম্ভাবনা বড়,বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
01-10-2026 12:27:05 PM
চট্টগ্রাম–কুনমিং সড়ক, সম্ভাবনা বড়,বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং পর্যন্ত সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের এই সম্ভাব্য সড়ক করিডোর চালু করা গেলে বাংলাদেশ ও চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। তবে এটি এখনো বাস্তবায়িত কোনো সড়কপথ নয়; বরং বাংলাদেশ-চীন আলোচনায় উত্থাপিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রস্তাব। 

গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে কুনমিং পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের কার্যকর সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। ইউনানের নির্বাহী ভাইস গভর্নর ঝাও জুনমিনের নেতৃত্বে ওই প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা গেলে দুই অঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহন প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য এ ধরনের যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আমদানি উৎস এবং দেশটি বাংলাদেশের শিল্পকারখানার জন্য তুলা, সুতা, কাপড়, কৃত্রিম তন্তু, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিল্প উপকরণ সরবরাহ করে। ২০২৫ সালে চীন থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানির মূল্য ছিল প্রায় ২২.৮১ বিলিয়ন ডলার। তবে এই পুরো অর্থকে পোশাকশিল্পের কাঁচামাল হিসেবে উল্লেখ করা সঠিক নয়। 


যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ১.১৩ বিলিয়ন ডলারের নির্দিষ্ট শ্রেণির কাপড় আমদানি করেছে এবং এর প্রায় ৫৬ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। ফলে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য স্থলপথ তৈরি হলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পের সরবরাহ-শৃঙ্খলে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে ২৪ ঘণ্টার পরিবহন সময়কে এখনই নিশ্চিত বাস্তব সময় হিসেবে দেখা যাবে না; এটি প্রস্তাবিত করিডোর কার্যকর হলে সম্ভাব্য সময় হিসেবে বলা হয়েছে। 


এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউনানের বাজার। বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৪ কোটি ৬৪ লাখ মানুষের এই প্রদেশে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছে। বৈঠকে প্রস্তাবিত ফ্রি-বন্ডেড ওয়্যারহাউস, প্রদর্শনী কেন্দ্র এবং কাস্টমস সুবিধা দ্রুত চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, মৎস্য এবং কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্যের জন্য এটি নতুন বাজার তৈরির সুযোগ দিতে পারে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ইউনানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১.৩ বিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়। 


তবে প্রস্তাবিত করিডোরের সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ মিয়ানমারের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী রাখাইন অঞ্চলে এখনো সশস্ত্র সংঘাত চলছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও রাখাইনের কিয়াউকতাও এলাকায় ভয়াবহ বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা অনিশ্চিত রয়েছে। 


বিশেষ করে বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন রাখাইনের বড় অংশে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সীমান্তের মিয়ানমার অংশে আরাকান আর্মির কার্যকর নিয়ন্ত্রণের কথা উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে সমঝোতা করলেই করিডোর চালু করা সম্ভব হবে না; মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষ এবং নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। 


আরেকটি বিষয় হলো, চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের বিদ্যমান অবকাঠামোর সব অংশও সম্পূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে চালু নেই। চলমান সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ স্থগিত বা ধীরগতির হয়েছে। ফলে “চীনের অংশের এক্সপ্রেসওয়ে ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ প্রস্তুত”—এমন বক্তব্যকে বর্তমানে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। 


তবু দীর্ঘমেয়াদে চট্টগ্রাম–মিয়ানমার–কুনমিং সড়ক যোগাযোগ আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে সমুদ্রনির্ভর সরবরাহব্যবস্থার পাশাপাশি স্থলপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে বৃহত্তর আঞ্চলিক লজিস্টিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা বাড়বে। চীন ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক হাব হিসেবে উন্নয়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। 


তবে করিডোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক লাভ, পরিবেশ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস, ট্রানজিট ফি এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক ঝুঁকি—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর বা অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিকে একমাত্র লক্ষ্য না করে বাংলাদেশের জন্য একাধিক নিরাপদ ও প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যপথ তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ-নিরাপত্তার দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ।

অতএব, চট্টগ্রাম–কুনমিং করিডোরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যথেষ্ট হলেও এটি এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি, সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমঝোতার ওপরই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে। সফল হলে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন স্থলবাণিজ্যিক দ্বার খুলতে পারে; কিন্তু বাস্তবায়নের আগে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে ধাপে ধাপে এগোনোই হবে মূল বিষয়।