রাজধানীজুড়ে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশু হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। একদিকে সন্তানকে সুস্থ করার লড়াই, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা—দুই সংকটের মাঝেই দিন কাটছে অসংখ্য পরিবারের। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো চিকিৎসা পেলে অধিকাংশ শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা ও স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের অপেক্ষা—কবে সুস্থ হবে তাদের সন্তান, কবে ফিরতে পারবেন স্বাভাবিক জীবনে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে আর্থিক সংকটে পড়েছে।
আট মাস বয়সী শিশু রায়হান ইসলাম হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। তাকে নিয়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছেন বাবা রাইসুল ইসলাম ও মা ফাতেমা বেগম। দীর্ঘ নয় বছর অপেক্ষার পর সন্তান লাভ করেছিলেন তারা। পরিবারের সব স্বপ্ন ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু ছিল রায়হান। কিন্তু হঠাৎ হামের আঘাতে সেই আনন্দময় জীবনে নেমে এসেছে দুশ্চিন্তার ছায়া।
ফাতেমা বেগম বলেন, “শিশুটির শ্বাসকষ্ট এত বেশি যে তা সহ্য করা কঠিন। ওর কষ্ট দেখে নিজেকে অসহায় লাগে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই সন্তান পেয়েছি। এখন শুধু চাই আল্লাহ আমার সন্তানকে সুস্থ করে দিন।”
রায়হানের বাবা রাইসুল ইসলাম জানান, হামে আক্রান্ত হওয়ার আগে শিশুটি ছিল প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি। ক্ষুধা লাগলে কাঁদত, কোলে উঠতে চাইত, খেলাধুলার ভঙ্গিতে হাত-পা নাড়াত। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর সবকিছু বদলে গেছে। নয় দিন ধরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাদের প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
তিনি বলেন, “এখন আমার ছেলে না হাসে, না কাঁদে, ঠিকমতো খেতেও পারে না। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, এমনকি তাকাতেও সমস্যা হয়। শুধু অপেক্ষা করছি কবে ও সুস্থ হবে।”
একই ধরনের দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দেড় বছর বয়সী নাফিসা আক্তারের পরিবারও। হামের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে সে রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এর আগে দুই দিন আইসিইউতেও চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে।
নাফিসার বাবা নাজমুল হাসান বলেন, “মেয়ের শারীরিক অবস্থার অগ্রগতি সম্পর্কে সবসময় পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। চিকিৎসা ব্যয়ও দিন দিন বাড়ছে। ওষুধের দাম অনেক বেশি। চিকিৎসার খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
শুধু রায়হান বা নাফিসা নয়, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি শিশু হাসপাতালে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জামিলের মা কামরুন নাহার বলেন, “সারা রাত সন্তানের পাশে জেগে থাকতে হয়। ও ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না, খেতেও চায় না। প্রতিটি মুহূর্ত উদ্বেগ আর কষ্টের মধ্যে কাটছে।”
হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ হাসপাতালের বাইরে থেকে কিনতে হয়। হাসপাতালের আশপাশের ফার্মেসিগুলোতে ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম তুলনামূলক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ওষুধ এক দোকানে পাওয়া না গেলে অন্য দোকানে খুঁজতে হয়, যা রোগীর স্বজনদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যানুলা, অক্সিজেনের জন্য প্রয়োজনীয় পানি, বিভিন্ন চিকিৎসা-সামগ্রীসহ অনেক কিছুই বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হয়। হাসপাতাল থেকে সীমিত কিছু ওষুধ ও ইনজেকশন সরবরাহ করা হলেও অধিকাংশ প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে হচ্ছে নিজস্ব অর্থে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ মনে করেন, এই পরিস্থিতি দেশের স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, “হাসপাতালগুলোর সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে এবং রোগীদের প্রয়োজনীয় সব সেবা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানোর এখনই সময়। সাধারণত কোনো মহামারি বা বড় সংকট দেখা দিলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো সামনে আসে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ চিকিৎসা নিতে ভয় পান, কারণ তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। এখন মধ্যবিত্তরাও চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে কষ্ট পাচ্ছেন। হাসপাতালের বেড সংখ্যা বৃদ্ধি এবং রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।”
অন্যদিকে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন বলেন, বর্তমানে অনেক শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি।
তার ভাষায়, “হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। তবে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে প্রায় ৯৯ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। তাই হাম হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে রোগটিকে অবহেলা করা যাবে না।”
তিনি বলেন, হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ফলে রোগ সেরে যাওয়ার পরও বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। এজন্য অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, সীমিত বাজেটের মধ্যেও হাসপাতাল রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, “যতটুকু সম্ভব বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে হাসপাতালের বাজেটের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় চাপও অনেক বেড়েছে। সেবার মান বজায় রাখতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “কিছু ওষুধের দাম অত্যন্ত বেশি, যেগুলো বাইরে থেকে কিনতে হয়। অনেক সময় অসচ্ছল রোগীদের জন্য চিকিৎসক বা হাসপাতালের কর্মীরা ব্যক্তিগত উদ্যোগেও সহায়তা করেন। তবে সবার প্রয়োজন পূরণ করা সবসময় সম্ভব হয় না। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এগিয়ে এলে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা আরও সহজ হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অপুষ্টি দূর করা, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে হামের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বর্তমানে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি শিশুদের স্বজনদের একটাই প্রার্থনা—তাদের সন্তান যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারে। আর সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা উপকরণ এবং সবার জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা।