ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬,
সময়: ০৮:১০:৪৩ PM

সহপাঠীদের স্মৃতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

মান্নান মারুফ
15-05-2026 11:44:27 AM
সহপাঠীদের স্মৃতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও অপপ্রচার চলে আসছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র, তাঁর শিক্ষক, সহপাঠী এবং তৎকালীন প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তারেক রহমান সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে তাঁর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে (১৩তম ব্যাচ) ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন। সে সময় তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতেই তিনি দেশের তৎকালীন অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল রাজনৈতিক সংঘাত, সেশনজট ও নিরাপত্তাহীনতার কেন্দ্রস্থল। ফলে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী, যিনি তারেক রহমানের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন, জানান—তারেক রহমান অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও বিনয়ী স্বভাবের ছাত্র ছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের ছাত্র হিসেবে তিনি নিয়মিত শিক্ষকদের সঙ্গে পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করতেন। অধ্যাপক নুরুল আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণেই তাঁর অনার্স সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পরবর্তীতে তারেক রহমান একটি কলেজ থেকে বিএ (পাস কোর্স) সম্পন্ন করেন এবং পরে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্স প্রিলিমিনারিতে ভর্তি হয়েছিলেন।

শিক্ষকের ভাষায়, একজন রাষ্ট্রপতির সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তারেক রহমান কখনও বিশেষ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি। সাধারণ শিক্ষার্থীর মতোই ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করেন এবং শিক্ষকদের প্রতি সর্বদা সম্মানজনক আচরণ করতেন। প্রয়াত অধ্যাপক রাজিয়া আক্তার বানুও তাঁর এই বিনয়ী আচরণের প্রশংসা করে কলাম লিখেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুলও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে, তারেক রহমান অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তিনি জানান, ১৯৮৫-৮৬ ব্যাচে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে তারেক রহমান কয়েক মাস নিয়মিত ক্লাসও করেছেন। আসিফ নজরুলের মতে, নিরাপত্তাজনিত কারণেই সম্ভবত তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

তারেক রহমানের সহপাঠীদের মধ্যেও দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের নাম উল্লেখযোগ্য।

একই ব্যাচের শিক্ষার্থী আলী মোস্তাফা খানও নিশ্চিত করেছেন যে, তারেক রহমান তাঁর সহপাঠী ছিলেন। তিনি জানান, ক্লাসরুমে তাঁদের একাধিকবার কথা হয়েছে এবং এ বিষয়ে সন্দেহ বা বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।

এছাড়া সাবেক শিক্ষার্থী মো. শাহ ওয়ালী উল্লাহ তাঁর স্মৃতিচারণে বলেন, ভর্তি পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষার দিন তিনি তারেক রহমানের কাগজপত্র খুঁজে পেয়ে তাঁকে ফেরত দিয়েছিলেন। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, এই তরুণটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পুত্র।

সম্প্রতি দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়ে তারেক রহমান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শিক্ষার্থীরা তাঁকে “ক্যাম্পাসের বড় ভাই” বলে স্লোগান দিয়ে স্বাগত জানান। এ সময় তিনি পুরোনো স্মৃতি স্মরণ করেন এবং ভবিষ্যতে আবারও ক্যাম্পাসে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বিদ্রূপ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালেও বাস্তবতা হলো—তিনি কখনও নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি করেননি। এমনকি নির্বাচনী হলফনামায়ও তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ‘এইচএসসি পাস’ উল্লেখ করেছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ‘ভুয়া ডিগ্রি’ বা ‘মিথ্যা পরিচয়’ দেওয়ার অভিযোগের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের বহু শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার শিক্ষাজীবন নানা রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। সেই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য।

মানুষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য বা বিভ্রান্তি ছড়ানো কোনো সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। মতপার্থক্য রাজনৈতিক হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা মিথ্যাচার কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, তবে তথ্য-প্রমাণ উপেক্ষা করে কাউকে হেয় করার চেষ্টা সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না। সত্য ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত।