ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:০৪:২৪ AM

বাংলাদেশের কোর্টে বল ঠেলে দিচ্ছেন মমতা

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
05-06-2026 12:04:24 AM
বাংলাদেশের কোর্টে বল ঠেলে দিচ্ছেন মমতা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান Mamata Banerjee-এর সাম্প্রতিক এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রসঙ্গ টেনে দেওয়া তার মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়।

বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক Emdadul Islam বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ওসমান হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্তরা ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সে সময় ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে তার আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারত রাষ্ট্রের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

তার ভাষায়, বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন মমতা। একই সঙ্গে তিনি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বল বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিতে চাইছেন, যা সমীচীন নয়।

অন্যদিকে ভারতের Rabindra Bharati University-এর অধ্যাপক Debajyoti Chand মনে করেন, একজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতার বক্তব্য অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন। তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর মতো উচ্চপদে থাকা অবস্থায় একজন ব্যক্তি নানা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সম্পর্কে অবগত হন। কিন্তু সেই তথ্য বা ইঙ্গিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত সংবেদনশীল পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে, অত্যন্ত অযৌক্তিক।

ড. দেবজ্যোতি চন্দ আরও বলেন, নির্বাচনে পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিক ভারসাম্য হারিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে অথবা তিনি অতিরিক্ত কৌশলী হওয়ার চেষ্টা করছেন। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অপ্রয়োজনীয় সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের সরকারের অবস্থান

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী Shama Obaed Islam এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, প্রতিবেশী দেশের একটি নির্বাচনে পরাজিত কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, বিষয়টি মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রসঙ্গ এবং এটি বাংলাদেশের আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত নয়। তবে ওসমান হাদি হত্যা মামলার বিচার নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার কার্যকর করার প্রচেষ্টা চলছে এবং এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের নীরবতা ও মামলা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের পর এখন পর্যন্ত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে তার মন্তব্যকে কেন্দ্র করে একটি মামলা দায়ের হয়েছে।

ভারতের Siliguri-এর আইনজীবী Rinki Sen Chattopadhyay বৃহস্পতিবার একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, একজন সাবেক সাংবিধানিক পদধারী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের অভ্যন্তরীণ ও গোপনীয় তথ্য এভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। এতে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

কী বলেছিলেন মমতা?

গত ২ জুন কলকাতার ধর্মতলায় এক জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের একটি আলোচিত হত্যা মামলার আসামি ভারতের মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করলে রাজ্য পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) তাকে গ্রেপ্তার করে।

মমতার দাবি, সে সময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে দেশের স্বার্থে বিষয়টি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছিলেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, “কাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছিল, কার নাম বেরিয়েছিল—সবই জানি। কিন্তু দেশের স্বার্থে এতদিন মুখ খুলিনি।”

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জনগণ বিষয়টি জানলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে, তাই তিনি নাম প্রকাশ করছেন না।

ওসমান হাদি হত্যা মামলা

Sharif Osman Hadi, যিনি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর তাকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। পরে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং তার সহযোগী আলমগীর-কে গত ৮ মার্চ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই সৃষ্টি করেনি, বরং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন সংবেদনশীল বিষয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্যে বিতর্কে না জড়িয়ে হত্যাকাণ্ডের বিচার ও অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণের বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।