জীবনের কঠিন বাস্তবতা, দারিদ্র্য আর সংগ্রামকে পেছনে ফেলে নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমের মাধ্যমে যে অসাধ্যকে সাধন করা যায়, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেত্রী ও বিধায়ক কলিতা মাঝি। একসময় অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালানো এই সাধারণ নারী আজ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তাঁর জীবনের এই অবিশ্বাস্য উত্থান এখন শুধু রাজনৈতিক মহলেই নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রিসভার বড় ধরনের সম্প্রসারণে ৩৫ জন নতুন মন্ত্রীর সঙ্গে শপথ নেন কলিতা মাঝি। তিনি রাজ্যের মন্ত্রীপরিষদে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। একসময়ের গৃহকর্মী থেকে রাজ্যের মন্ত্রী হওয়ার এই যাত্রা অনেকের কাছেই রূপকথার গল্পের মতো মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিরলস অংশগ্রহণের ইতিহাস।
পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রাম এলাকার বাসিন্দা কলিতা মাঝির জীবন শুরু থেকেই ছিল সংগ্রামে ভরা। ২০০৬ সালে একজন প্লাম্বারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামীর সীমিত আয়ের পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে তাঁকে বিভিন্ন বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতে হয়েছে। রান্নার সহকারী হিসেবে কাজ করা, ঘর পরিষ্কার করা, বাসন মাজা ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজের মাধ্যমে মাসে কয়েক হাজার টাকা উপার্জন করতেন তিনি। সেই সামান্য আয় দিয়েই চলত সংসার।
তবে অর্থনৈতিক কষ্ট তাঁকে কখনও স্বপ্ন দেখা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। সাধারণ মানুষের সমস্যা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগই তাঁকে রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করে তোলে। তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন এবং তৃণমূল স্তরে কাজ শুরু করেন। বুথ কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করলেও মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে তিনি দলের আস্থা অর্জন করেন।
কলিতা মাঝি একাধিকবার বলেছেন যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বে পৌঁছানোর গল্প তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল। সেই অনুপ্রেরণায় তিনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার চেষ্টা চালিয়ে যান এবং রাজনীতিকে মানুষের সেবার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে আউশগ্রাম কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন কলিতা মাঝি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে গিয়েছেন, তাঁদের সমস্যার কথা শুনেছেন এবং নিজের সংগ্রামী জীবনের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “একজন গৃহকর্মীও চাইলে রাজনীতিতে আসতে পারে এবং মানুষের জন্য কাজ করতে পারে।” তাঁর এই সরল বার্তা ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। শেষ পর্যন্ত তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীকে ১২ হাজার ৫৩৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেন।
তবে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও কলিতা মাঝি তাঁর শেকড়কে ভুলে যাননি। নির্বাচনে জয়লাভের পরদিনও তিনি নিজের বাড়িতে সাধারণ গৃহিণীর মতো রান্না ও কাপড় ধোয়ার কাজ করেছেন। তাঁর এই সাধারণ জীবনযাপন এবং বিনয়ী মনোভাব মানুষের কাছে তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও কষ্টকে কখনও ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর কলিতা মাঝি জানান, তিনি বিশেষভাবে পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের উন্নয়নে কাজ করতে চান। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং দরিদ্র পরিবারের জীবনমান উন্নত করাকে তিনি নিজের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি জঙ্গলমহল ও অন্যান্য অনগ্রসর অঞ্চলের উন্নয়নেও তিনি কাজ করতে আগ্রহী বলে জানান।
কলিতা মাঝির জীবনগাথা প্রমাণ করে যে জন্মগত অবস্থান বা আর্থিক সীমাবদ্ধতা কোনো মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। কঠোর পরিশ্রম, সততা, আত্মবিশ্বাস এবং মানুষের প্রতি আন্তরিকতা থাকলে যে কেউ সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। একজন গৃহকর্মী থেকে রাজ্যের মন্ত্রী হওয়ার তাঁর এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি সমাজের লাখো সংগ্রামী নারী ও তরুণের জন্য আশার আলো এবং অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।