ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:০৫:২৪ AM

বেড়েছে হত্যাকাণ্ড, উদ্বেগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
05-06-2026 12:05:24 AM
বেড়েছে হত্যাকাণ্ড, উদ্বেগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত ১০০ দিনে দেশজুড়ে অন্তত ২২৯টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৪৯ জন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। ২৭ মে সরকারের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হয়। এই সময়ে বিভিন্ন খাতে সরকার বেশ কিছু ইতিবাচক ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিলেও জননিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি দেখা যায়নি বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ড

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাত বছর বয়সী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। একইভাবে নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলায় তিন বছরের শিশুসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হত্যার ঘটনাও জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী, শিশু ও পরিবারের একাধিক সদস্যকে লক্ষ্য করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সংবাদ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ২২৯টি হত্যাকাণ্ড

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ‘হত্যাকাণ্ড’, ‘খুন’, ‘হত্যা’, ‘ধর্ষণের পর হত্যা’, ‘ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা’সহ সংশ্লিষ্ট সংবাদ পর্যালোচনা করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনাগুলো বাদ দিয়ে যাচাই-বাছাই শেষে অন্তত ২২৯টি হত্যাকাণ্ড এবং ২৪৯ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সব ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ভুক্তভোগীদের বড় অংশ তরুণ ও শিশু

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হত্যার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু ও তরুণ। ২৪৯ জন নিহতের মধ্যে ৫১ জনের বয়স দুই মাস থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ মোট ভুক্তভোগীর ২০ শতাংশেরও বেশি শিশু ও কিশোর।

অন্যদিকে, দুই মাস বয়স থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত মোট ১১৫ জন হত্যার শিকার হয়েছেন, যা মোট নিহতের প্রায় ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ খুন হওয়া ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেকই ৩০ বছরের কম বয়সী।

এই পরিসংখ্যান দেশের তরুণ প্রজন্ম ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে বাড়তির প্রবণতা

১০০ দিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি মাসেই হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে।

১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২ দিনে ১৩টি ঘটনায় ১৪ জন নিহত হন। মার্চ মাসে ৪২টি হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান ৪৩ জন।

এপ্রিল মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩টিতে। সে মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এপ্রিলের শেষ দিকে সংঘটিত কয়েকটি নৃশংস ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

২০ এপ্রিল রাতে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এক নারী ও তার নবজাতকের গলিত মরদেহ মাটিচাপা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরদিন নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

সময়ের ধারাবাহিক বিশ্লেষণ বা টেম্পোরাল ফেজিং পদ্ধতিতে তথ্য মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারির শেষাংশ থেকে শুরু করে মার্চ ও এপ্রিলে হত্যাকাণ্ড ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মে মাসের মাত্র ২৭ দিনেই ৯৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং নিহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে।

ঢাকায় সর্বাধিক হত্যাকাণ্ড

অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের আট বিভাগের মধ্যে ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গত ১০০ দিনে এ বিভাগে ৮৫টিরও বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং প্রাণহানি হয়েছে শতাধিক মানুষের। মোট হত্যাকাণ্ডের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ঘটেছে এই বিভাগে।

রাজধানী ঢাকা ছাড়াও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ জেলায় হত্যার হার তুলনামূলক বেশি ছিল।

হত্যার সংখ্যার বিচারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। সেখানে অর্ধশতাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা মোট ঘটনার প্রায় ২২ শতাংশ।

অন্যদিকে সবচেয়ে কম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পাওয়া গেছে রংপুর ও বরিশাল বিভাগে। এই দুই বিভাগে ১০০ দিনে ৯টি করে হত্যার খবর পাওয়া গেছে, যা মোট ঘটনার প্রায় ৪ শতাংশ করে।

এছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে ১১টি এবং সিলেট বিভাগে ১৩টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। জাতীয় হিসাব অনুযায়ী দুই বিভাগের অংশ প্রায় ৫ শতাংশ করে। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে ২৫টি করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা মোট ঘটনার প্রায় ১০ শতাংশ করে।

ধর্ষণ, মাদক ও পরকীয়াজনিত বিরোধ বড় কারণ

হত্যাকাণ্ডের কারণ বিশ্লেষণেও কয়েকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা উঠে এসেছে। অন্তত ২২টি ঘটনায় ধর্ষণের আগে বা পরে ভুক্তভোগীকে হত্যা করা হয়েছে।

২৩টি ঘটনায় মাদকসংশ্লিষ্ট বিরোধ, মাদক কারবার বা মাদকাসক্তির প্রভাবের বিষয়টি পাওয়া গেছে। এছাড়া ১২টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়াজনিত বিরোধের সূত্র পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, পারিবারিক সহিংসতা এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার সংস্কৃতি এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে।

নারী ও শিশু সবচেয়ে ঝুঁকিতে

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১০০ দিনে নিহতদের মধ্যে ৯৩ জনই নারী এবং আট বছরের কম বয়সী শিশু। অর্থাৎ মোট ভুক্তভোগীর প্রায় ৩৭ শতাংশ নারী ও অল্পবয়সী শিশু।

এই তথ্য নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরেছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের দাবি

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান জননিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, পারিবারিক হত্যাকাণ্ড এবং মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধ বৃদ্ধির প্রবণতা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

তাদের মতে, অপরাধ দমনে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি, বিচার প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব। অন্যথায় হত্যাকাণ্ডের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের জননিরাপত্তার জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।