২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোও সেই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবের মুখে পড়ে। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় ও সংকটের মধ্যে থাকার পর এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরতে শুরু করেছে জোটের কয়েকটি শরিক দল। বিশেষ করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এবং গণতন্ত্রী পার্টি নতুন করে সাংগঠনিক কার্যক্রম ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শুধু দলটিই নয়, তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্ররাও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ থাকার কারণে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়। অনেক নেতা আত্মগোপনে চলে যান, আবার অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এবং জাসদের সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর গ্রেপ্তার। তাদের বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মোড় আসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। তবে আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম এখনও নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে জোটের অন্য শরিক দলগুলোর ওপর কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে প্রায় দুই বছর রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকার পর শরিক দলগুলো নতুন করে নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। দলগুলোর নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনের পর দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদ ইতোমধ্যে মাঠে সক্রিয় হওয়ার দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথমদিকে তারা সরাসরি দলীয় ব্যানারের পরিবর্তে কৃষক, শ্রমিক, যুব ও বিভিন্ন গণসংগঠনের ব্যানারে কর্মসূচি পালন করে। পরে ধীরে ধীরে দলীয় পরিচয়ে কর্মসূচি আয়োজন শুরু করে। গত ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে সমাবেশ ও র্যালির আয়োজন করে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ। দীর্ঘ সময় পর প্রকাশ্যে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া গত ২৩ মে রাজধানীর গুলিস্তানে শিশু রামিশা হত্যাকাণ্ড এবং শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন, সমাবেশ ও মিছিল কর্মসূচি পালন করে জাসদ। দলটির নেতারা বলছেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে তারা নিয়মিত কর্মসূচি পালন করার পরিকল্পনা করছেন।
ওয়ার্কার্স পার্টির নেতাদের মতে, বর্তমানে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় নিয়মিত খোলা হচ্ছে এবং নেতাকর্মীরা সেখানে বৈঠক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। দলটি বিভিন্ন দিবসভিত্তিক কর্মসূচিও পালন শুরু করেছে। পাশাপাশি আগামী দিনে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে আরও কর্মসূচি ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
দলটির নেতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তারা সরকারবিরোধী কোনো কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে চান না। বরং জনস্বার্থ, নাগরিক সমস্যা, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন এবং দলের সভাপতি রাশেদ খান মেননের মুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করেই তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি আবর্তিত হবে।
একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে জাসদও। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটাই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে এবং বিভিন্ন সামাজিক ও জনস্বার্থমূলক ইস্যুতে কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি দলটির সভাপতি হাসানুল হক ইনুর মুক্তির দাবিও রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম বিষয় হবে।
শুধু ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ নয়, ১৪ দলীয় জোটের অন্য শরিক দলগুলোর মধ্যেও নতুন করে সক্রিয় হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ন্যাপ এবং গণতন্ত্রী পার্টির নেতারাও জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে প্রকাশ্যে কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি অনুকূল এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা অনেকটাই কমেছে।
ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তফা আলমগীর রতন বলেছেন, মে দিবসে তারা সফলভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও কিছু কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। তার ভাষায়, বর্তমানে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ন্যাপের সহসভাপতি ইসমাইল হোসেনও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো। গণমানুষের সমস্যা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন এবং মৌলবাদবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সামনে রেখে দলটি নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করবে। এ বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও ১৪ দলীয় জোটের অন্যান্য শরিক দলগুলোর সামনে এখন নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন করা এবং জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আওয়ামী লীগ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সরকারবিরোধী অবস্থান এড়িয়ে জনস্বার্থ ও সামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে তারা আবারও রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী মাসগুলোতে এসব দলের কর্মসূচি ও সাংগঠনিক তৎপরতা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।