ঢাকা, বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০১:১১:১৬ PM

মিলাদুন্নবী (সা.): শান্তি ও মানবতার বার্তা

আফসানা আরেফিন
26-08-2026 11:53:08 AM
মিলাদুন্নবী (সা.): শান্তি ও মানবতার বার্তা

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সমগ্র মুসলিম জাহানের জন্য কেবল একটি বিশেষ দিন বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি মানবজাতির ইতিহাসে এক চিরন্তন মহাসন্ধিক্ষণ। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল পবিত্র মক্কার শুষ্ক মরুপ্রান্তরে আখিরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এঁর পবিত্র শুভ আগমন ঘটেছিল। যে সময়ে পুরো বিশ্ব অন্যায়, অবিচার, অন্ধকার ও অমানবিকতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সে সময়ে তিনি বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে আবির্ভূত হন। মহানবীর জীবনের প্রতিটি দিক তার নৈতিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, দর্শন, সামাজিক সাম্য ও বিশ্বসাহিত্যে তার স্থান মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে আজও সমানভাবে অমলিন।

​মহান আল্লাহ তাআলা সুরা আল-আনবিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, "আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত (দয়া ও করুণা) হিসেবেই প্রেরণ করেছি।" কুরআনের এই বাণী প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এঁর আগমন কেবল কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা গোত্রের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন পুরো সৃষ্টির জন্য এক করুণার বিশ্বজনীন উৎস। কুরআনের অন্যান্য আয়াতেও তার চরিত্রকে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বা উত্তম আদর্শ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। নবীজি (সা.) এঁর আগমন ও জীবনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল তা তিনি নিজেই তার হাদিসে ব্যাখ্যা করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতার পূর্ণতা বিধানের জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি।" ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য লুকিয়ে আছে এই নৈতিক বিপ্লবের মধ্যে। তিনি সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সুবিচারের যে বাণী প্রচার করেছিলেন তা তার বিদায় হজের ভাষণে চিরন্তন রূপ লাভ করে। বর্ণবাদ, বংশমর্যাদার অহংকার ও শ্রেণীভেদ দূর করে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, তাকওয়া বা খোদাভীতি ছাড়া অন্য কোনো মানদণ্ডে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নেই।

​বিশ্বের বিভিন্ন অমুসলিম দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এঁর জীবন ও দর্শনে মুগ্ধ হয়ে তাকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মাইকেল এইচ. হার্ট তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'The 100' (ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তি)-এ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এক নম্বর স্থানে রেখেছেন কারণ তিনি ধর্মনীতি ও রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে চূড়ান্ত সফল একজন বিশ্বনেতা ছিলেন। অন্যদিকে বিখ্যাত আইরিশ সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক জর্জ বার্নার্ড শ উল্লেখ করেছিলেন যে আধুনিক বিশ্ব যদি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এঁর মতো একজন মহামানবের হাতে শাসনভার তুলে দিত তবে তিনি বিশ্বকে এমন এক শান্তিময় অবস্থায় নিয়ে যেতে পারতেন যা আজকের দিনে মানবজাতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নবীজি (সা.) একটি চরম বিভক্ত ও গোত্রভিত্তিক সমাজকে বিশ্বের সবচেয়ে সুসংগঠিত, সাম্যবাদী ও মানবিক সমাজে রূপান্তরিত করেছিলেন।

​অনেকে মনে করেন ইসলাম কেবল আচার-অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক, অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এঁর শিক্ষা ছিল জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানমনস্কতার এক অপার উৎস। কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ বাণীই ছিল ‘ইকরা’  অর্থাৎ পড়ো। রাসুল (সা.) জ্ঞানার্জনকে প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ বা অবশ্যকরণীয় করেছিলেন এবং দূরদূরান্তে গিয়ে হলেও জ্ঞান অর্জনের তাগিদ দিয়েছিলেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আজ যে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি ও কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলে, রাসুল (সা.) ১৪০০ বছর আগেই মহামারীর সময় সংক্রমিত এলাকা ত্যাগ না করার ও বাইরের লোক না আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় তিনি গাছ লাগানো, পানির অপচয় না করা এবং পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়ার যে আদেশ দিয়েছিলেন তা আজকের আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

​রাসুলুল্লাহ (সা.)-এঁর মহান ব্যক্তিত্ব শুধু মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের নয় বরং বিশ্বসাহিত্যের দিকপালদেরও গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। জার্মান সাহিত্যের মহান পুরুষ ইওহান ভলফগাং ফন গ্যাটে নবীজি (সা.)-এর প্রতি এতটাই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে তিনি তাকে উৎসর্গ করে লিখেন বিখ্যাত কবিতা 'Mahomet's Gesang' (মুহাম্মদের গীতি)। এতে তিনি নবীজির জীবনকে এক মহাসমুদ্রের প্রবাহের সাথে তুলনা করেন যা মানুষকে স্রষ্টার দিকে নিয়ে যায়। প্রাচ্যের কবি আল্লামা ইকবাল এবং আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে নাত-ই-রাসুল এবং মিলাদুন্নবীর আবেগ। নজরুল আবেগমথিত গলায় গেয়েছেন, "ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায় / আয় রে আয় কালমা শাহাদাতের তরণী বইয়া..."।

​বর্তমান পৃথিবী যখন সহিংসতা, বর্ণবাদ, যুদ্ধ ও মানসিক অস্থিরতায় জর্জরিত তখন পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর গুরুত্ব ও শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ঈদে মিলাদুন্নবী কেবল উৎসব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয় বরং এটি মহানবীর জীবনদর্শনকে নিজের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নেওয়ার দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন চরম শত্রুর প্রতিও ক্ষমাশীল ও দয়াবান। তায়েফের ময়দানে পাথরের আঘাতে রক্তে ভেসে যাওয়ার পরও তিনি তাদের ধ্বংস চাননি বরং তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেছিলেন। আজকের সমাজে যখন পরমতসহিষ্ণুতার চরম অভাব তখন নবীজির এই ক্ষমা ও উদারতার আদর্শই পারে আমাদের সামাজিক শান্তি ফিরিয়ে দিতে।

​পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ মহানবীর সুন্নাহ ও আদর্শের অনুসরণ। কুরআন, হাদিস, আধুনিক বিজ্ঞান, বিশ্ব দর্শন ও সাহিত্যের নির্মোহ মূল্যায়নে এটি স্পষ্ট যে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এঁর দেখানো পথই মানবজাতির জন্য একমাত্র কল্যাণকর ও শান্তিময় পথ। এই পবিত্র দিনে আমাদের শপথ হওয়া উচিত তার নৈতিকতা, সততা, ন্যায়বিচার ও ভালোবাসার শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করে এক সুন্দর ও শান্তিময় বিশ্ব গড়ে তোলা।

​লেখক: কবি, সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও এমফিল গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।