ঢাকা, শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৪:২৮:৩০ PM

৫ কোটি খরচ করেও, ডেঙ্গুর আরো ঊর্ধ্বগতি

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
21-08-2026 11:45:53 AM
৫ কোটি খরচ করেও, ডেঙ্গুর আরো  ঊর্ধ্বগতি

মশা নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ব্যয় বাড়লেও কমছে না মশার উপদ্রব। বরং বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বাড়ায় দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। গত ১০ মাসে শুধু মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতেই প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা খরচ করেছে চসিক। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে নগরের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পাওয়া গেছে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকার মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনেছে চসিক। এর মধ্যে পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের ওষুধ (অ্যাডাল্টিসাইড) কিনতে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং লার্ভা ধ্বংসের ওষুধ (লার্ভিসাইড) কিনতে ৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ফগার ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিন কিনতে ব্যয় হয়েছে আরও ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

গত ৩০ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশক নিধন খাতে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়। ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ায় এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এর আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। এ সময়ে মারা গেছেন তিনজন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৬৩ জন।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬৬৩ জন। জুলাইয়ে আক্রান্ত হন ৫৩৬ জন। অর্থাৎ দুই মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

চট্টগ্রামে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবরকে ডেঙ্গুর মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। ২০২২ সালে এ সময়ে আক্রান্ত ছিলেন ২ হাজার ৬৪০ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৩ জনে। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৭৩৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬০ জন।

সাড়ে চার বছরের হিসাবেও ডেঙ্গুর ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। ২০২২ সালে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৪৪৫ জন, মৃত্যু হয় ৪১ জনের। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে রেকর্ড ১৪ হাজার ৮৭ জনে দাঁড়ায়; মৃত্যু হয় ১০৭ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৩২৩ জন, মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন, মৃত্যু হয় ২৭ জনের। চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ, মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

জরিপে এডিসের উদ্বেগজনক চিত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক-বর্ষা জরিপে নগরের ১৮টি ওয়ার্ডে এডিস মশার বিস্তারের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ৮ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯টিতে এডিসের লার্ভা পাওয়া যায়। ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি মেলে।

জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।

উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম ও দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা এবং দক্ষিণ হালিশহরকে উচ্চঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বলেন, জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপ্টাই। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানি এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিস মশার বড় প্রজননস্থল হয়ে উঠেছে।

৩৫৫ কর্মী দিয়ে ৭০ লাখ মানুষের নগর

গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে চসিক। এর বাইরে ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ ছিল ৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

চসিকের ৪১টি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ৩৫৫ জন কর্মী। সংস্থাটির দাবি, প্রতিটি ব্লকে ৭২ ঘণ্টা পরপর ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয় না।

চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রায় ৭০ লাখ মানুষের নগরীতে সাড়ে তিনশর কিছু বেশি কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন। তারপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের চেয়ে লার্ভা ধ্বংস বেশি কার্যকর হওয়ায় ফগিংয়ের পাশাপাশি লার্ভা ধ্বংসে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শুধু ফগিংয়ে সমাধান নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মশা রয়েছে, কোথায় প্রজননস্থল এবং কোন কীটনাশক কার্যকর—এসব নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. আহসান হাবিব সিয়াম বলেন, মশা নিধন কার্যক্রমে কীটতত্ত্ববিদদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়া বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

নগর পরিকল্পনাবিদ মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারে মশার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তাই কোন ওষুধ কার্যকর, তা নিয়মিত পরীক্ষাগারে যাচাই করা দরকার।

চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি জানান, ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৬০ সদস্যের বিশেষ দল কাজ করছে। আগামী ছয় মাসের জন্য পর্যাপ্ত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড মজুত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। বাসাবাড়ি, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র ও নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমতে না দিলে এডিস মশার প্রজনন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।