ঢাকা, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৭:১১:০২ PM

প্রকল্প বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
12-07-2026 05:54:00 PM
প্রকল্প বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ

চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) দ্রুত ও নিরাপদে খালাসের লক্ষ্যে নেওয়া সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পকে ঘিরে আবারও নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি, কাজের মান, প্রজেক্ট কমপ্লিশন রিপোর্ট (পিসিআর) চূড়ান্ত হওয়ার আগেই অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (ওঅ্যান্ডএম) অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এসপিএম প্রকল্পের অপারেটর নিয়োগে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সীমিত করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কিংবা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগের জবাব দেয়নি।

প্রকল্পটি শুরুতে প্রায় ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন পেলেও পরবর্তী সময়ে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকায় পৌঁছায়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও নির্মাণকাজ প্রত্যাশিত মানে সম্পন্ন হয়নি। ফলে প্রকল্পের পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসপিএম প্রকল্পের অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের সময় নির্বাচনকালীন সংবেদনশীল সময়কে বেছে নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিন দরপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়। ওই সময়ে ভিসা-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কতার কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে আসতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

জানা গেছে, মোট ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দরপত্রের নথি সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দেয়। কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সময় বাড়ানোর আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নির্বাচনকালীন অনিশ্চয়তার কারণে পূর্ণাঙ্গ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে এ বিষয়ে বিপিসি বা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৮ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে মেয়াদ শেষ হলেও এখনও প্রজেক্ট কমপ্লিশন রিপোর্ট (পিসিআর) চূড়ান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটি একাধিকবার পরীক্ষামূলকভাবে চালুর চেষ্টা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। ২০২৪ সালের ২৪ জুন পরীক্ষামূলকভাবে ক্রুড অয়েল খালাসের সময় পাইপলাইনে লিকেজ দেখা দেওয়ার ঘটনাও প্রকল্পটির নির্মাণমান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের ভাষ্য, এখনও প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার সংশোধনমূলক কাজ বাকি রয়েছে। তাদের দাবি, এসব কাজ সম্পন্ন এবং পিসিআর চূড়ান্ত হওয়ার আগেই অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে এই দাবির বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা যায়নি।

দরপত্রে অংশ নেওয়া তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অংশগ্রহণকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন দেশে বিতর্ক বা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও একই গোষ্ঠীর কাছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, এতে স্বার্থের সংঘাত (ঈড়হভষরপঃ ড়ভ ওহঃবৎবংঃ) তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের প্রকল্পে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অনুসরণ করা হয়। কারণ নির্মাণ ত্রুটি থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়নের প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক বিধান কোনটি প্রযোজ্য, তা সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব, বিপিসির চেয়ারম্যান এবং দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের অবস্থান জানা সম্ভব হতো। প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এসপিএম প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রকল্প বাস্তবায়ন, নির্মাণমান, অপারেটর নিয়োগ এবং দরপত্র প্রক্রিয়া—সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রয়োজন হলে স্বাধীন কারিগরি ও প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। এতে প্রকল্পের প্রতি জনআস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নেও সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে।