ঢাকা, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬,
সময়: ১০:৫৩:০৭ AM

ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে ডিআইজি

স্টাফ রিপোটার।। ঢাকাপ্রেস২৪.কম
17-05-2026 07:50:21 PM
ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে ডিআইজি

দেশে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিশেষ করে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ সামনে এলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি চাকরির সীমিত বেতনে এত বিপুল সম্পদের উৎস কী? সম্প্রতি পুলিশের এক ডিআইজি কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ আবারও সেই প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের ডিআইজি তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ গড়ে তোলা এবং ব্যক্তিগত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি এবং সত্যতা পাওয়া গেলে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানার কলাপাড়া গ্রামে তৌহিদুল ইসলাম প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ট্রিপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, বাড়িটিতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি বিলাসবহুল স্থাপত্যশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার মিরপুরে ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন এলাকায় তার একটি ১০ তলা বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ভবনটিতে তার বোনজামাতা, যিনি একজন সেনা কর্মকর্তা, বসবাস করেন।

এছাড়াও কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে বোনের বাড়ির পাশে আরও একটি চারতলা ভবন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদরে তার নামে বাড়ি থাকার তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে এসব সম্পদের পরিমাণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে সম্পদের উৎস নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো হাওরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জমির মালিকানা। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, অষ্টগ্রামের বড়হাওর মৌজায় প্রায় ৭০০ একর এবং ইটনা থানার কাটাখাল মৌজায় প্রায় ৬০০ একর জমি তার বা তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রায় ১৩০০ একর জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া নিজ গ্রামে প্রায় আড়াইশ গরুর একটি বড় ডেইরি খামার গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। বাজিতপুর ও কুলিয়ারচর এলাকায় বিলাসবহুল বাগানবাড়ির অস্তিত্বের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত এড়াতে এবং সম্পদের প্রকৃত মালিকানা গোপন করতে তৌহিদুল ইসলাম নিকটাত্মীয়দের নাম ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে খুলনায় তার শ্বশুরের মাধ্যমে পরিচালিত একটি বড় মাছের ঘের এবং নোয়াখালীতে ব্যাংকার বোনের মাধ্যমে পরিচালিত প্রায় ২ একরের একটি সুপারি বাগানের তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদ প্রকৃতপক্ষে তার নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হচ্ছে।

আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে গুরুতর নৈতিক স্খলনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২০ সালে “স্নেহা আক্তার” (ছদ্মনাম) নামে এক কিশোরীর সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কের ঘটনায় একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে তৎকালীন কারা মহাপরিদর্শকের কাছে অভিযোগ করা হলেও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। অভিযোগকারী আরও দাবি করেছেন, বর্তমানে ওই নারী ও তার সন্তান মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিআইজি তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “অভিযোগগুলো সত্য নয়। আমি পারিবারিকভাবে সম্পদের মালিক। চাকরিতে যোগদানের সময়ই আমার সম্পদের হিসাব সরকারকে প্রদান করা হয়েছে।” তার দাবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে হেয় করার জন্য এসব তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগটি কমিশনের কাছে পৌঁছেছে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করা হবে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ উঠলেও কেন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক অভিযোগ চাপা পড়ে গেছে। ফলে জনগণের মধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তবে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হবে; আর যদি সত্য হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে যারা অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত, তাদের সম্পদের উৎস যাচাই করে প্রয়োজনে জব্দ করার দাবিও উঠেছে।

সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, শুধু একজন ডিআইজিই নয়, বিভিন্ন খাতে যেসব ব্যক্তি দুর্নীতি, অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের সবার বিরুদ্ধে সমানভাবে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহলেই আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা শক্তিশালী হবে।

তবে অভিযোগের বিষয়ে এখনো আদালতে কোনো চূড়ান্ত রায় হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তও প্রক্রিয়াধীন। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করার সুযোগ নেই। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সাধারণ মানুষের।