বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুঃসময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিয়ে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। এ আলোচনায় উঠে এসেছে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় কর্মী আরিফুর রহমান তুষারের নাম। দীর্ঘদিন ধরে দলের কঠিন সময়ে ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
তাঁদের দাবি, দলের দুঃসময়ে যারা নিষ্ঠা, সাহস ও ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সুবিধাবাদী ও হাইব্রিড নেতাদের প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
আরিফুর রহমান তুষার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বগুড়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা তুষারের রাজনৈতিক পথচলা শুরু ছাত্রজীবন থেকেই। সে সময় তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে কাজ করে আসছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি রিজভীর আস্থাভাজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দলীয় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তুষারকে সৎ, নিষ্ঠাবান ও ধর্মানুরাগী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তাঁদের মতে, ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে দলীয় দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক পথচলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তিগত দায়িত্ব পালন
তুষারের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় বিগত সরকারের সময়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, গত দেড় দশকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে স্কাইপের মাধ্যমে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সময় তুষার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ওই কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁকে নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। এ কারণে বিগত সরকারের সময়ে তিনি একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে তাঁকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন বাহিনী একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়েছিল বলেও দাবি করেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা। কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য হিসেবে পরিচিত তুষার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন বলে জানান ঘনিষ্টজনরা।।
যথাযথ মূল্যায়নের দাবি
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির নেতৃত্ব ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টন এবং যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তুষারের মতো দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীর অভিজ্ঞতা ও অবদান যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে মনে করছেন তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
তাঁদের মতে, দলের দুঃসময়ে যারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেছেন এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত থেকেছেন, তাঁদের অবদান উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তৃণমূলের কিছু নেতা-কর্মীর মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, দলের সুসময়ে নতুন করে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের অবদান ও যোগ্যতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক আনুগত্য, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও ত্যাগের যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমেই দায়িত্ব বণ্টন করা উচিত।
দলের জন্য কী বার্তা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সাধারণভাবে দলীয় কর্মীদের অবদানের স্বীকৃতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের কর্মীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সাংগঠনিক সংহতি বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
আরিফুর রহমান তুষারকে ঘিরে ওঠা মূল্যায়নসংক্রান্ত অভিযোগ তাই কেবল একজন ব্যক্তির দায়িত্বপ্রাপ্তির প্রশ্ন নয়; বরং দলের দুঃসময়ের কর্মীদের অবদান কীভাবে স্বীকৃতি পাবে, সেই বৃহত্তর আলোচনারও অংশ। তবে তাঁর বিষয়ে দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কিংবা ভবিষ্যৎ দায়িত্ব সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় ত্যাগ ও নিষ্ঠার স্বীকৃতি প্রত্যাশা করা যেকোনো কর্মীর জন্য স্বাভাবিক। এখন দেখার বিষয়, বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা তুষারের অবদান ও অভিজ্ঞতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন এবং পরীক্ষিত কর্মীদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেন।