কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে এক সময় মাত্র ২০০ টাকা দৈনিক মজুরিতে ঝাড়ুদার হিসেবে চাকরি শুরু করেছিলেন সৈয়দ আলী ওরফে সবুজ। কয়েক বছর আগে তিনি সেখানে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে স্থায়ী হয়ে বর্তমানে নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তার বাস্তব জীবনযাপন যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প বলে।ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে তার নামে বা পরিবারের নামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এলাকায় তার পরিচিতি একজন বড়মাপের কাস্টমস কর্মকর্তা হিসেবে। নিয়মিত দান-খয়রাত করা থেকে শুরু করে পারিবারিক অনুষ্ঠান আয়োজন—সবই হয় বেশ আড়ম্বরপূর্ণভাবে। সম্প্রতি ছেলের সুন্নতে খতনার অনুষ্ঠানও করেছেন রাজসিক আয়োজনের মাধ্যমে।
নৈশপ্রহরীর বিস্ময়কর উত্থানের গল্প
ঝাড়ুদার থেকে নৈশপ্রহরী
রাজধানীর মতিঝিলের দিলকুশায় অবস্থিত জীবন বীমা টাওয়ারের চতুর্থ তলায় কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে মাস্টার রোলে ঝাড়ুদার হিসেবে চাকরি শুরু করেছিলেন সৈয়দ আলী। দীর্ঘদিন পরে তিনি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে স্থায়ী হন এবং বর্তমানে নৈশপ্রহরীর দায়িত্বে আছেন।
কিন্তু নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রবেশ করলেই যেন বদলে যায় তার পরিচয়। সেখানে তিনি পরিচিত একজন প্রভাবশালী কাস্টমস কর্মকর্তা হিসেবে। গত কয়েক বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় এলাকায় তাকে নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও অনেকেই মুখ খুলতে চান না।
অল্প ভাড়ার ঘর থেকে কোটি টাকার সম্পদ
সরেজমিনে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকায় গিয়ে জানা যায়, এক সময় ‘মাস্টার ভিলা’ নামের একটি বাড়িতে মাত্র ৮০০ টাকা মাসিক ভাড়ায় এক কামরায় জীবন শুরু করেছিলেন সৈয়দ আলী।
কিন্তু বর্তমানে তার সম্পদের তালিকা বেশ দীর্ঘ।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকার কালু হাজী রোডে তার রয়েছে—
-
দুটি দোতলা বাড়ি
-
প্রায় ৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ৫ তলা বাড়ি
-
৬ কাঠা জমিতে এক পাশে একতলা পাকা দালান এবং অপর পাশে ২০ কক্ষের আধা-পাকা টিনশেড বাড়ি
এছাড়া মিজমিজি দক্ষিণপাড়া এলাকার এ ব্লকের ৩৩৫/১ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৩ কাঠা জমির ওপর সদ্য নির্মিত তিনতলা বাড়িও রয়েছে তার।
এলাকাবাসী আরও জানান—
-
ঢাকার রায়েরবাগে রয়েছে কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট
-
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গাউসিয়া বাণিজ্যিক এলাকায় রয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৫ কাঠা জমির প্লট
সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাংবাদিক দেখেই তালা
এসব সম্পদের খোঁজ পাওয়ার পর সাংবাদিকরা যখন সৈয়দ আলীর ৫ তলা বাড়িতে যান, তখন সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার স্ত্রী বাড়ির ভেতরে প্রবেশে বাধা দেন। পরে ফ্ল্যাটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর শুরু হয় নানা ধরনের “ম্যানেজ” করার চেষ্টা।
সৈয়দ আলীর স্ত্রী দাবি করেন, এসব সম্পদ তারা ৭০-৮০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে করেছেন। তবে ঋণের কোনো কাগজপত্র আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার কাছে কোনো কাগজ নেই।
তবে বাড়িগুলো তাদের—এ কথা তিনি অকপটে স্বীকার করেন।
সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য তিনি সাংবাদিকদের কাছে একাধিকবার সমঝোতার অনুরোধও করেন বলে জানা গেছে। এ সময় এলাকাবাসী কেউ কথা বলতে চাইলে তাদের প্রতিও অশোভন আচরণ করেন তিনি।
সম্পদ নিজের নয় দাবি
এ বিষয়ে সৈয়দ আলীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, এসব সম্পদ তার নয়।
তার ভাষায়,
তার ভাই ও শ্যালক বিদেশে থাকেন, এসব সম্পদ মূলত তাদের।
তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
বরং তিনি বিভিন্নভাবে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন—
“স্যার আমি আইস্যা আমনের লগে দেহা করমু। আমনের আর কষ্ট করতে হইবো না স্যার। আমি দেহা করমু স্যার, যেহানে কইবেন হেয়ানেই দেহা করমু।”
প্রশ্নের মুখে সম্পদের উৎস
একজন নৈশপ্রহরীর চাকরি করে কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব—এ প্রশ্ন এখন এলাকাবাসীসহ অনেকের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।সম্পদের উৎস নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে বেরিয়ে আসতে পারে এই রহস্যের আসল চিত্র—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা।