ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:৪৪:৪২ AM

উপন্যাস: তোমাকে ভালবাসি

মান্নান মারুফ
16-03-2026 11:56:45 AM
উপন্যাস: তোমাকে ভালবাসি

পর্ব–

ঐশি কখনও চঞ্চল, আবার কখনও অদ্ভুত রকম চুপচাপ হয়ে যেত। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত স্বচ্ছতা—যেন ভোরের শিশিরে ভেজা কোনো নীল আকাশ। তার মনটা ছিল খুবই পরিষ্কার, সরল আর কোমল। ছোটবেলা থেকেই সে এমনই—হাসলে যেন চারপাশে আলো ছড়িয়ে পড়ত, আর কাঁদলে মনে হতো আকাশের মেঘও ভারী হয়ে উঠেছে।

স্কুলজীবন শেষ করে ঐশি কলেজে ভর্তি হলো। ভাগ্যের এক অদ্ভুত মিল—কুদ্দুছও একই কলেজে ভর্তি হলো, একই বিষয়ে, মানবিক শাখায়। যেন অদৃশ্য কোনো সুতো তাদের দুজনকে একই পথে বেঁধে রেখেছে।

প্রতিদিন সকালবেলা তারা প্রায় একই সময় কলেজে যেত। রাস্তার দুপাশে শিউলি গাছের নিচে সাদা ফুল ঝরে থাকত, আর সেই ফুলের গন্ধে ভরে উঠত সকালের বাতাস। কুদ্দুছ হাঁটতে হাঁটতে কখনও একটু সামনে থাকত, আবার কখনও একটু পেছনে। ঐশিও কখনও পাশে হাঁটত, কখনও দূরে।

তাদের চলাফেরা এমনই ছিল যে দূর থেকে কেউ দেখলে বুঝতেই পারত না—তারা দুজন একে অপরের খুব কাছের মানুষ। মনে হতো তারা যেন শুধু সহপাঠী, এর বেশি কিছু নয়।

তবু তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য টান ছিল।
নীরব অথচ গভীর।

কুদ্দুছের বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক—কঠোর, শৃঙ্খলাপরায়ণ মানুষ। তিনি সবসময় চাইতেন তার ছেলে বড় হয়ে একজন ভালো মানুষ হোক, সমাজে সম্মান নিয়ে বাঁচুক। অন্যদিকে ঐশির বাবা ছিলেন একজন মাওলানা। গ্রামের মানুষ তাকে অত্যন্ত সম্মান করত। ধর্মীয় শিক্ষা নৈতিকতার ব্যাপারে তিনি খুবই কঠোর ছিলেন।

তবু সেই কঠোর মানুষটিই তার মেয়েকে কলেজে পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন, শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে।

কুদ্দুছ কখনও বাড়িতে একা থাকত না। সবসময় কোনো না কোনো অজুহাত খুঁজে বের করত। কখনও বলত—
আজ লাইব্রেরিতে পড়তে হবে।”
কখনও বলত—
বন্ধুর সাথে নোট তৈরি করতে হবে।”

কিন্তু আসল সত্য ছিল অন্য কিছু।

সে শুধু ঐশির সাথে একটু সময় কাটাতে চাইত।

ঐশিও মাঝে মাঝে পড়াশোনার কোনো সমস্যা দেখিয়ে কুদ্দুছের কাছে চলে আসত। হাতে খাতা, চোখে অদ্ভুত এক লজ্জা মাখা হাসি।

একদিন বিকেলে কলেজের লাইব্রেরির সামনে বড় আমগাছটার নিচে বসে ছিল তারা। হালকা বাতাস বইছিল। দূরে মাঠে কিছু ছেলেরা ক্রিকেট খেলছিল।

ঐশি খাতার পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল,
কুদ্দুছ, এই কবিতাটা বুঝতে পারছি না।”

কুদ্দুছ খাতার দিকে তাকিয়ে বলল,
কোথায় সমস্যা?”

ঐশি আঙুল দিয়ে একটা লাইন দেখাল।
কুদ্দুছ একটু পড়ল, তারপর মৃদু হাসল।

এই লাইনটা আসলে ভালোবাসার কথা বলছে।”

ঐশি অবাক হয়ে তাকাল,
ভালোবাসা?”

কুদ্দুছ একটু চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
হ্যাঁ… এমন একটা অনুভূতি, যেটা কাউকে না বললেও বোঝা যায়।”

ঐশি কিছু বলল না। শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছিল।

সেই মুহূর্তে তাদের দুজনের মধ্যে যেন হাজারটা অজানা কথা ভেসে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু কেউ মুখে আনল না।

দিনগুলো এমনই কেটে যাচ্ছিল।

কলেজের করিডোরে দেখা, লাইব্রেরিতে একসাথে বসে পড়া, কখনও রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে দুই-একটা কথা বলা—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে তাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠছিল।

কুদ্দুছ মাঝে মাঝে বুঝতে পারত—ঐশি শুধু বন্ধু নয়। তার হৃদয়ের ভেতরে আরেকটা গভীর জায়গা দখল করে ফেলেছে মেয়েটা।

কিন্তু সে কখনও সাহস পায়নি সেটা বলার।

কারণ সে জানত—তাদের দুজনের পৃথিবী আলাদা।

একজন শিক্ষকের ছেলে, আর একজন মাওলানার মেয়ে।

গ্রামের মানুষের চোখ, সমাজের নিয়ম—সবকিছু যেন তাদের মাঝখানে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

একদিন বিকেলে আকাশটা খুব মেঘলা ছিল। হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। সবাই তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে যাচ্ছে।

ঐশি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটা বই।

কুদ্দুছ কাছে গিয়ে বলল,
বৃষ্টি থামলে যেও।”

ঐশি মৃদু হাসল,
তুমি কি যাবে না?”

কুদ্দুছ একটু থেমে বলল,
তুমি গেলে আমিও যাব।”

ঐশির চোখে তখন এক অদ্ভুত আলো।

বৃষ্টি একটু কমতেই তারা একসাথে হাঁটা শুরু করল। রাস্তার কাদামাটিতে পা পিছলে যাচ্ছিল।

হঠাৎ ঐশির পা পিছলে গেল।

কুদ্দুছ দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল।

ঐশির হাতটা কুদ্দুছের হাতে কাঁপছিল। দুজনেই একে অপরের চোখের দিকে তাকাল

তারপর ঐশি ধীরে হাতটা সরিয়ে নিল।

মৃদু স্বরে বলল,
ধন্যবাদ…”

কুদ্দুছ কিছু বলল না।

সেই ছোট্ট স্পর্শটা যেন তার হৃদয়ের ভেতর ঝড় তুলে দিয়েছিল।

সেদিন রাতে কুদ্দুছ ঘুমাতে পারছিল না। বারবার তার মনে পড়ছিল ঐশির সেই লজ্জা মাখা চোখ।

অন্যদিকে ঐশিও জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ।

তার মনে হচ্ছিল—জীবনের কোনো অদ্ভুত পথে সে হেঁটে যাচ্ছে।

যেখানে আনন্দ আছে, আবার অজানা ভয়ও আছে।

দিন যেতে লাগল।

কিন্তু অজান্তেই তাদের গল্পটা ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের চোখে পড়তে শুরু করল।

কেউ কেউ ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল।

মাওলানার মেয়ে নাকি কলেজের একটা ছেলের সাথে বেশি মিশছে…”

এই কথাগুলো একদিন গিয়ে পৌঁছাল ঐশির বাবার কানে।

সেদিন সন্ধ্যায় ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা ছিল।

ঐশির বাবা গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন।

ঐশি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ তিনি কঠোর কণ্ঠে বললেন,
তুমি কি কুদ্দুছ নামে কোনো ছেলের সাথে বেশি মিশছ?”

ঐশির বুকটা ধক করে উঠল।

সে কিছু বলতে পারল না।

নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।

সেই নীরবতার ভেতরেই যেন শুরু হলো এক নতুন ঝড়ের আগমনী সুর।

আর দূরে কোথাও—অদৃশ্য নিয়তির আকাশে—ধীরে ধীরে জমতে লাগল এক অশ্রুসিক্ত ট্রাজেডির কালো মেঘ।

কুদ্দুছ তখনও জানত না—
তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলো খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে।

আর ঐশিও বুঝতে পারছিল না—
যে ভালোবাসা এতদিন নীরবে ফুলের মতো ফুটছিল, সেটাই হয়তো একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনার কারণ হয়ে উঠবে।

চলবে…