শেষ পর্ব
কুদ্দুছের মৃত্যুর পর পুরো গ্রাম যেন এক অদ্ভুত শোকের ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল। এমন ঘটনা এই গ্রামে আগে কখনও ঘটেনি। মানুষের মুখে মুখে শুধু একটাই কথা—একটি ছেলের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর এক অসমাপ্ত গল্প।
ঐশিদের বাড়ির উঠোনে তখনো মানুষের ভিড়। কেউ কাঁদছে, কেউ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুদ্দুছের নিথর শরীরটা যখন গাব গাছের নিচ থেকে নামানো হলো, তখন অনেকের চোখেই পানি চলে এসেছিল।
কারণ সবাই জানত—এই ছেলেটা খারাপ ছিল না।
সে শুধু ভালোবেসেছিল।
কিন্তু সেই ভালোবাসার পরিণতি এত ভয়াবহ হবে—এটা কেউ ভাবেনি।
এই ঘটনার পর ঐশির বিয়ের আয়োজন এক মুহূর্তেই থেমে গেল।
ছেলে পক্ষ প্রথমে হতবাক হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে তারা সেখান থেকে চলে গেল। কেউ আর এই বিয়ের কথা তুলল না।
ঐশির বাবা চুপচাপ হয়ে গেলেন। গ্রামের মানুষও তাকে দোষ দিতে পারল না, আবার পুরো ঘটনাটাকে ভুলতেও পারল না।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি বদলে গেল ঐশি।
সেদিনের পর থেকে ঐশির জীবনে যেন সবকিছু থেমে গেছে।
সে আর আগের মতো হাসে না।
আগে যে মেয়েটি মাঝে মাঝে হাসতে হাসতে পুরো বাড়ি ভরিয়ে দিত, এখন সে সারাদিন চুপচাপ থাকে।
ঐশির মা মাঝে মাঝে তাকে জিজ্ঞেস করেন—
“মা, কি হয়েছে তোমার?”
ঐশি শুধু মৃদু হাসে।
কিন্তু সেই হাসির ভেতর এতটা বেদনা লুকিয়ে থাকে যে সেটা দেখলে কারও চোখে পানি এসে যায়।
কুদ্দুছের মৃত্যুর পর অনেকবার ঐশির বিয়ের কথা উঠেছিল।
গ্রামের মানুষ, আত্মীয়স্বজন—সবাই বলেছে—
“জীবন তো থেমে থাকে না।”
কিন্তু ঐশি একটাই কথা বলেছে—
“আমি আর বিয়ে করব না।”
তার কণ্ঠে তখন এমন দৃঢ়তা ছিল যে কেউ আর তাকে জোর করতে পারেনি।
সময় কেটে গেছে।
এক বছর… দুই বছর… পাঁচ বছর…
গ্রামের অনেক কিছু বদলে গেছে। নতুন ঘর উঠেছে, নতুন মানুষ এসেছে, অনেক পুরোনো মানুষ চলে গেছে।
কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি—
ঐশির নীরবতা।
সে এখনো একা।
মাঝে মাঝে বিকেলের দিকে তাকে দেখা যায় ঐশিদের বাড়ির পেছনের দিকে হাঁটতে যেতে।
সেই জায়গাটায়—যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরোনো গাব গাছ।
গাছটা এখনো আগের মতোই আছে।
বাতাসে তার পাতা দুলে ওঠে, আর মাঝে মাঝে ঝরে পড়ে শুকনো পাতা।
ঐশি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে গাছটার নিচে।
কখনও গাছের কাণ্ডে হাত রাখে।
কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
গ্রামের কিছু মানুষ দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে।
কেউ কেউ ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলে—
“ঐশি এখনো কুদ্দুছকে ভুলতে পারেনি।”
কিন্তু সত্যিটা হয়তো আরও গভীর।
ঐশি শুধু ভুলতে পারেনি—সে যেন আজও তাকে খুঁজে বেড়ায়।
সারাক্ষণ কি যেন খুঁজে ঐশি।
কিন্তু তার সেই খোঁজ শেষ হয় না।
কেউ যদি কখনও তাকে জিজ্ঞেস করে—
“তুমি কি খুঁজছ?”
ঐশি মৃদু কণ্ঠে বলে—
“আমি কুদ্দুছকে খুঁজছি।”
এই কথাটা শুনে অনেকেই চুপ হয়ে যায়।
কারণ তারা জানে—এই খোঁজের কোনো শেষ নেই।
একদিন বিকেলে ঐশি আবার সেই গাব গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
আকাশে তখন হালকা মেঘ। বাতাসে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা।
ঐশি ধীরে ধীরে গাছের দিকে তাকাল।
তার চোখে পানি জমে উঠল।
সে মৃদু স্বরে বলল—
“কুদ্দুছ… তুমি আমাকে ক্ষমা করো।”
তার মনে পড়তে লাগল সেই চিঠির লাইনগুলো—
“তুমি ভালো থেকো…”
ঐশির বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
সে মনে মনে বলল—
“তুমি জানো না কুদ্দুছ… আমি কখনো তোমাকে ঘৃণা করিনি। শুধু ভয় পেয়েছিলাম।”
তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।
তারপর খুব ধীরে সে ফিসফিস করে বলল—
“জনমে জনমে মিশে রব সনে…
কথা দিলাম আজ তোর…”
বাতাস তখন হালকা দুলছিল।
গাছের পাতা মৃদু শব্দ করছিল।
ঐশি আবার বলল—
“প্রাণ গেলে যাক… কুদ্দুছ যাবে না…
মিছে নয় এই ঘোর…”
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল—এই কথাগুলো শুধু বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে না।
কোথাও যেন কেউ শুনছে।
হয়তো সময়ের ওপারে, অদৃশ্য কোনো জগতে।
ঐশি ধীরে ধীরে গাছটার কাণ্ডে মাথা ঠেকাল।
তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো।
সে মনে মনে ভাবল—
হয়তো এই জীবনে তাদের গল্প শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু ভালোবাসা কি কখনও সত্যিই শেষ হয়?
হয়তো অন্য কোনো জন্মে…
অন্য কোনো সময়ে…
তারা আবার একসাথে হাঁটবে সেই পুরোনো পথ ধরে।
গ্রামের মানুষ এখনো মাঝে মাঝে সেই গাব গাছটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
কেউ কেউ নতুন প্রজন্মকে গল্প শোনায়।
তারা বলে—
“অনেক বছর আগে এখানে এক ছেলের ভালোবাসার গল্প শেষ হয়েছিল।”
তারপর তারা গাছটার দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে বলে—
“এখানেই শেষ হয়েছিল কুদ্দুছের ভালোবাসার গল্প…”
কিন্তু হয়তো সত্যিটা অন্যরকম।
গল্পটা শেষ হয়নি।
গল্পটা এখনো বেঁচে আছে—
ঐশির নীরব চোখে,
সেই গাব গাছের পাতার শব্দে,
আর সময়ের বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক চিরন্তন ভালোবাসায়।
সমাপ্ত