ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০১:৪৪:৪২ AM

উপন্যাস: তোমাকে ভালবাসি

মান্নান মারুফ
16-03-2026 12:45:54 PM
উপন্যাস: তোমাকে ভালবাসি

পর্ব–

অনেকদিন কেটে গেছে। সময় তার নিজের নিয়মে এগিয়ে চলেছে, কিন্তু কুদ্দুছের জীবনে যেন সময় থমকে আছে সেই জায়গাতেই—যেখানে ঐশি তার জীবন থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।

এক বিকেলে কুদ্দুছ বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। আকাশের রঙ লালচে হয়ে উঠেছে, যেন দিনের শেষ আলোতে পৃথিবীকে বিদায় জানাচ্ছে।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল ঐশিদের বাড়ির দিকে।

বাড়ির সামনে আজ অদ্ভুত এক ব্যস্ততা।

অনেক মানুষের আনাগোনা। কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে। উঠোনে কয়েকজন লোক বসে কথা বলছে। ভেতর থেকে মাঝে মাঝে হাসির শব্দ ভেসে আসছে।

কুদ্দুছ থেমে গেল।

তার মনে হঠাৎ একটা প্রশ্ন জেগে উঠল—
এত মানুষ কেন ঐশিদের বাড়িতে?”

সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর অকারণেই এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করতে লাগল।

কুদ্দুছ একটু এগিয়ে গেল। রাস্তার পাশেই তার এক পরিচিত লোক দাঁড়িয়ে ছিল। সে ধীরে জিজ্ঞেস করল—

ভাই, ঐশিদের বাড়িতে এত ভিড় কেন?”

লোকটা হালকা হেসে বলল—
জানো না নাকি? ঐশিকে দেখতে ছেলে পক্ষ এসেছে।”

কুদ্দুছ যেন মুহূর্তের মধ্যে কিছুই বুঝতে পারল না।

কি বললেন?”—তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

লোকটা আবার বলল—
হ্যাঁ, ঢাকা থেকে একটা ছেলে এসেছে। ভালো চাকরি করে নাকি। তাই দেখতে এসেছে।”

এই কথাটা শুনে কুদ্দুছের মাথার ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল।

চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ ঝাপসা হয়ে উঠল।

সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছিল—তার বুকের ভেতর কেউ যেন ধীরে ধীরে একটা ভারী পাথর বসিয়ে দিয়েছে।

তার শরীরটা কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গেল।

ধীরে ধীরে সে সেখান থেকে সরে এল।

রাস্তার পাশে একটা পুরোনো গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াল।

তার মাথার ভেতর তখন একটার পর একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

ঐশি…
ঐশিকে অন্য কেউ দেখতে এসেছে।

এই কথাটা সে যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।

তার মনে হচ্ছিল—কেউ যেন তার জীবনটা হঠাৎ করে ছিনিয়ে নিতে এসেছে।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে গাছের গুঁড়িতে বসে পড়ল।

তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল অনেক পুরোনো দৃশ্য।

সেই কলেজের দিনগুলো…
সেই একসাথে হাঁটা…
সেই হাসি…

সবকিছু যেন আজও তার হৃদয়ের ভেতরে জীবন্ত হয়ে আছে।

কিন্তু আজ সেই মানুষটাকে অন্য কেউ নিজের করে নিতে আসছে।

এই চিন্তাটা তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল।

কুদ্দুছ নিজের সাথে নিজেই কথা বলতে লাগল—

আমি কি তাহলে এতটাই অচেনা হয়ে গেলাম তার কাছে?”

তার চোখ ভিজে উঠল।

সে জানে—ঐশি অনেকদিন ধরেই তার সাথে কথা বলে না। তাকে এড়িয়ে চলে।

তবুও কোথাও একটা আশার আলো ছিল তার মনে।

সে ভাবত—একদিন হয়তো ঐশি তার ভুল বুঝতে পারবে। একদিন হয়তো আবার কথা বলবে।

কিন্তু আজকের এই খবর সেই ছোট্ট আশাটুকুও ভেঙে দিল।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তার শরীর যেন ভারী হয়ে গেছে।

সে ভাবতে লাগল—
এখন আমি কি করব?”

তার মনে হচ্ছিল—ঐশি ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না।

ঐশি তার জীবনের এমন এক অংশ হয়ে গেছে, যাকে ছাড়া সবকিছু শূন্য মনে হয়।

কিন্তু ঐশি যদি সত্যিই অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলে?

এই চিন্তাটা তাকে প্রায় পাগল করে দিচ্ছিল।

সে হাঁটতে হাঁটতে আবার ঐশিদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।

দূর থেকে দেখতে লাগল।

বাড়ির ভেতরে আলো জ্বলছে। মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। কেউ হাসছে, কেউ কথা বলছে।

এই আনন্দের ভেতরেই যেন কুদ্দুছের হৃদয়ের সমস্ত আলো নিভে যাচ্ছে।

তার মনে হচ্ছিল—সে যেন এই পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ।

হঠাৎ তার মনে হলো—সে কি ঐশির সাথে একবার কথা বলবে?

সবকিছু খুলে বলবে?

বলবে—
আমি সত্যিই তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।”

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা ভয় তাকে থামিয়ে দিল।

যদি ঐশি আবার তাকে অপমান করে?

যদি আবার বলে—
আমার জীবন থেকে দূরে থাকো।”

এই চিন্তা তাকে আরও ভেঙে দিল।

কুদ্দুছ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হচ্ছিল—সে যেন এক অদৃশ্য যন্ত্রণার ভেতর আটকে গেছে।

ধীরে ধীরে রাত নেমে এল।

আকাশে চাঁদ উঠেছে।

কুদ্দুছ তখনো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে ঐশির মুখ।

সে মনে মনে বলল—

ঐশি… তুমি যদি জানত, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি।”

তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল।

সে অনুভব করল—ভালোবাসা কখনও কখনও মানুষকে এতটাই দুর্বল করে দেয় যে সে নিজের জীবনকেও তুচ্ছ মনে করতে শুরু করে।

কুদ্দুছ হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

কিন্তু তার পা যেন ঠিকমতো চলছিল না।

মনে হচ্ছিল—তার ভেতরের মানুষটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।

আর সেই ভাঙনের শব্দ শুধু সে একাই শুনতে পাচ্ছে।

আজ তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—

ঐশি কি সত্যিই অন্য কারও হয়ে যাবে?

যদি তাই হয়…
তাহলে কুদ্দুছের জীবনের গল্পটা কোথায় গিয়ে শেষ হবে?

সে নিজেও জানে না।

কিন্তু একটা জিনিস সে বুঝতে পারছে—

এই ভালোবাসা তাকে হয়তো এমন এক পথে নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফিরে আসা আর সম্ভব হবে না।

চলবে…