আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের দেওয়া একটি আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) ঘিরে আলোচনায় থাকা কর্মকর্তা জেসমিন নাহারকে বর্তমান সরকার সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে পদোন্নতি দিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়। এর আগে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কারা অনুবিভাগ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
জেসমিন নাহারের এই পদোন্নতির পর প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ তাকে ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন নিষ্ঠাবান সৈনিক’ উল্লেখ করে একটি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে তাকে নিজের মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব পদে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছিল।
আমাদের হাতে আসা ২০২২ সালের ২ নভেম্বর ইস্যু করা ওই ডিও লেটারে দেখা যায়, এটি তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের কাছে পাঠানো হয়েছিল। চিঠিতে শরীফ আহমেদ উল্লেখ করেন, তৎকালীন মানসিক প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত জেসমিন নাহার তার ব্যক্তিগত পরিচিত এবং একজন দক্ষ, সৎ ও কর্মনিষ্ঠ কর্মকর্তা।
চিঠিতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী লিখেছিলেন, “জেসমিন নাহার মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন নিষ্ঠাবান সৈনিক। তিনি আমার দেখা অত্যন্ত দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ কর্মকর্তা। মাঠ প্রশাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে অত্যন্ত দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন বলে আমি অবহিত।”
একই চিঠিতে শরীফ আহমেদ আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তর-অধিদপ্তর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব কার্যক্রমে গতি আনতে দক্ষ কর্মকর্তার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মত দেন।
ডিও লেটারে তিনি সুপারিশ করে বলেন, জেসমিন নাহারকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদে পদায়ন করা হলে তিনি তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে আরও গতিশীলতা আনতে সক্ষম হবেন বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস।
বর্তমান সরকারের আমলে জেসমিন নাহারকে সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার পর সেই পুরোনো ডিও লেটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সুপারিশ পাওয়া একজন কর্মকর্তা কীভাবে বর্তমান সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি পেলেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নানা ধরনের মতামত ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
তবে এ বিষয়ে জেসমিন নাহারের বক্তব্য জানা যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ওই ডিও লেটার প্রসঙ্গে তার মতামত জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে ডিও লেটারের বিষয়বস্তু কিংবা বর্তমান পদোন্নতি নিয়ে তার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, সরকারি প্রশাসনে বিভিন্ন কর্মকর্তার পদায়ন বা বদলির ক্ষেত্রে ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্র ব্যবহার নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিক আদর্শ বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের উল্লেখ করে সুপারিশ করা হলে তা প্রায়ই বিতর্কের জন্ম দেয়। জেসমিন নাহারের ক্ষেত্রেও সেই পুরোনো ডিও লেটারের বিষয়টি সামনে আসার পর তার সচিব পদে নিয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও সরকার এ পদোন্নতির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি এবং নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনেও ডিও লেটার বা অতীতের সুপারিশের কোনো উল্লেখ নেই। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহল ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।