ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০১:২৮:১২ PM

পরিত্যক্ত জয়িতা ভবনে মাদকের আড্ডা

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
13-07-2026 12:01:45 PM
পরিত্যক্ত জয়িতা ভবনে মাদকের আড্ডা

নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্য নিয়ে বান্দরবানে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘জয়িতা ভবন’ হস্তান্তরের তিন বছর পরও চালু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় ভবনটি এখন মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) যন্ত্র, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামসহ কোটি টাকার সরকারি সম্পদ চুরির ঘটনাও ঘটেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের চারপাশে নিয়মিত মানুষের উপস্থিতি নেই। ভবনের বিভিন্ন অংশে অবহেলার স্পষ্ট চিহ্ন ফুটে উঠেছে। কোথাও কোথাও জানালা-দরজার ক্ষয়ক্ষতি, ভাঙচুর এবং অযত্নের চিত্র চোখে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যক্রম না থাকায় ভবনটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবী ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল করিম বলেন, সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করলেও সেটি জনগণের কোনো কাজে লাগছে না। বরং কার্যক্রম না থাকায় এটি এখন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ ওই এলাকা এড়িয়ে চলেন।

আরেক বাসিন্দা শিউলি বেগম বলেন, নারীদের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করতেই জয়িতা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বছরের পর বছর এটি বন্ধ থাকায় প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় নারীরা। দ্রুত ভবনটি চালু করা হলে অনেক নারী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেতেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এভাবে অযত্নে পড়ে থাকা দুঃখজনক। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের মূল্যবান যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে যাচ্ছে। সরকারি সম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারীদের জন্য বিপণিবিতান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর প্রায় তিন বছর আগে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে প্রয়োজনীয় পরিচালনা ব্যবস্থা, অর্থ বরাদ্দ ও পরিকল্পনার অভাবে ভবনটিতে এখনো কোনো কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে বান্দরবান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান বলেন, ভবনটি নারীদের বিপণিবিতানের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ শেষে প্রায় তিন বছর আগে এটি মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে ভবনটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের।

অন্যদিকে বান্দরবান পার্বত্য জেলার মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুপন চাকমা বলেন, ভবনটি শহর থেকে অনেক দূরে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে সেখানে যেতে নারীরা আগ্রহ দেখান না। পরিকল্পনার দিক থেকে এটি একটি দুর্বল সিদ্ধান্ত ছিল। শহরের কাছাকাছি স্থানে ভবনটি নির্মাণ করা হলে এর কার্যকারিতা অনেক বেশি হতো।

তিনি আরও বলেন, ভবনটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও এটি পরিচালনার জন্য কোনো পৃথক অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে জনবল নিয়োগ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিয়মিত কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি। এ সুযোগে ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মূল্যবান সরকারি সম্পদ চুরি হয়েছে। পাশাপাশি রাতের বেলায় সেখানে মাদকসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি জানান, ভবনটি কীভাবে দ্রুত কার্যকরভাবে চালু করা যায়, সে বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আলোচনা চলছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে ভবনটিকে নারীদের জন্য একটি কার্যকর বিপণিবিতান ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি স্থাপনাটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। তাই ভবনটি দ্রুত চালু করে নিয়মিত নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।