ঢাকা, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৮:৩০:০৬ PM

দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবে শেখ হাসিনা

রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার শেখ হাসিনার
10-07-2026 07:31:52 PM
দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবে শেখ হাসিনা

ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়সূচির কথা জানান।এক ঘণ্টার এই সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সি শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘তবুও আমাকে যেতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মীদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হচ্ছে। মৃত্যু যদি আসেই, তবে আমি চাই সেটি আমার নিজের মাটিতে আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।’

নির্বাসনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন

২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে কয়েক মেয়াদে ২০ বছর ধর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়। গত নভেম্বরে দেশটির যুদ্ধাপরাধ আদালত একটি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে। নির্বাসন থেকে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

যধংরহধ
এ বছরই দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা
দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ঢাকা যখন স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, তখন তার এই প্রত্যাবর্তন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক এই দেশটির রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, এটি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি হওয়া শীতল সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে পারে, যা নয়াদিল্লি তাকে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে বেশ খারাপ পর্যায়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ বারবার ভারতকে তাকে প্রত্যর্পণের (ফেরত পাঠানোর) অনুরোধ জানিয়েছে।

হাসিনা ভারতে অবস্থানের সময় গণমাধ্যমগুলোর লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও এর আগে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি। তিনি জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে বা কখন ফিরবেন সে সম্পর্কে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেননি।

এবারই প্রথম তিনি তার ফেরার একটি সময়সূচি নির্ধারণ করে জানান যে তিনি নিজে ও নির্বাসিত অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতারা আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধেও মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। রয়টার্স দলটির অন্যান্য নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি বা তারা কোথায় আছেন সেটাও নিশ্চিত করতে পারেনি।

শেখ হাসিনা বলেন, তাকে দেশে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকার বারবার ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানাচ্ছে।
এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, এ জন্য বারবার ভারতকে চিঠি পাঠাচ্ছে। কিন্তু এবার আমি নিজেই দেশে ফিরে যাব।

হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্ররা কোনো সাড়া দেননি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে গত এপ্রিলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে তারা হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ পরীক্ষা করে দেখছে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে চায় ভারত।

সামরিক অভ্যুত্থানে তার বাবা ও পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য হত্যার শিকার হওয়ার পর রাজনীতির পাদপ্রদীপে আসেন হাসিনা। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী চরিত্র।

তিনি শুরুর দিকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন। ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিমপ্রধান দেশটির অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কৃতিত্ব তাকে দেওয়া হয়। তবে তার দীর্ঘ শাসনামলে ভিন্নমত দমন এবং গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। যদিও অভিযোগগুলো তিনি অস্বীকার করেছেন।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার পতনের কারণ হওয়া সেই অভ্যুত্থানে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল।

দিল্লি থেকে হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তাই আমি বলেছি যে এবার আমি দেশে ফিরছি এবং আপনাদের সবাইকেও ফিরে আসা উচিত। সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’

তবে তিনি তার ফেরার সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা ঠিক কখন এবং কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান।

তিনি বলেন, ‘আমি বিচারে বিশ্বাস করি। আমি মনে করি একবার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক। আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।’

জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন

গণমাধ্যম এবং সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার, মামলা ও হামলার মুখোমুখি হয়েছেন।

হাসিনা বলেন, ‘দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয়।’

অতীতেও বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জেল খাটার বিষয়ে আমি চিন্তিত নই।’
১৯৮১ সালে তার বাবার হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাসন থেকে ফিরে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় তিনি বারবার আটক হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগে ২০০৭ সালে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দুর্নীতির অভিযোগে তিনিও কারাবরণ করেছিলেন।

এবারের দেশত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি জানান করেন যে, জনতা যখন তার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন তার জীবনের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘একটি সরকার যখন দীর্ঘ সময় কাজ করে, তখন ভুল হতেই পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।’

হাসিনা জানান, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাদের নিয়ে অনলাইন সভা করেছেন।

হাসিনা বলেন, ‘তারা হয়তো আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব না। কিন্তু কেন তারা আওয়ামী লীগকে স্থগিত (নিষিদ্ধ) করবে? আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, তবে জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন।’