ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১২:০৭:৫৯ PM

ইডিসিএলে ওষুধের কাঁচামাল কেনায় বড় অনিয়ম

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
09-07-2026 10:28:13 AM
ইডিসিএলে ওষুধের কাঁচামাল কেনায় বড় অনিয়ম

সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)-এর ওষুধ তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ অনিয়ম, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং অতিমূল্যে ক্রয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই অনিয়ম এখনো অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্রয় প্রক্রিয়াকে বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশাসনিক কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করে একই মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যাপক অপচয় ঘটছে।

সূত্র জানায়, ইডিসিএল বর্তমানে প্রায় ১৩০ ধরনের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করে। এসব ওষুধ তৈরিতে বছরে প্রায় ১৬৭ ধরনের রাসায়নিক কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল সরবরাহের বড় অংশই একই ব্যক্তির মালিকানাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠান—মার্কস কর্পোরেশন, সানবীম কর্পোরেশন এবং আর কে ট্রেডার্স—পেয়ে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক শরীয়তপুরের আমিনুল ইসলাম রুবেল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে ইডিসিএলের কাঁচামাল সরবরাহে একচেটিয়া অবস্থান তৈরি করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্র মূল্যায়নের সময় এমন সব শর্ত আরোপ করা হচ্ছে, যা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের জন্য পূরণ করা কঠিন। এমনকি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দরপ্রস্তাবও নানা অজুহাতে বাতিল করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও কারিগরি মূল্যায়নের অযৌক্তিক মন্তব্য দেখিয়ে দরপত্র বাতিলের নজির রয়েছে।

এর একটি উদাহরণ হিসেবে ক্যালসিয়াম ল্যাকটেট পেন্টাহাইড্রেট ক্রয়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেলজিয়ামে উৎপাদিত এই কাঁচামালের দর ছিল প্রতি টন ২ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার। কিন্তু কারিগরি মূল্যায়নে ‘গন্ধ ভালো নয়’—এমন মন্তব্য করে সেই প্রস্তাব বাতিল করা হয়। পরে একই পণ্য প্রতি টন ৪ হাজার ২০০ ডলার দরে ক্রয় করা হয়। শুধু এই একটি পণ্যেই বছরে প্রায় ২ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এন্টাসিড ওষুধ তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ম্যাগনেসিয়াম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইডিসিএলের বছরে প্রায় ৩৫০ টন ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য প্রতি টন ১ হাজার ৭৮০ থেকে ১ হাজার ৮০০ ডলারের মধ্যে থাকলেও ইডিসিএল তা ৩ হাজার ১৫০ থেকে ৩ হাজার ২০০ ডলার দরে কিনেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান পারড্রাগস কেমিক্যালসের উৎপাদিত ম্যাগনেসিয়াম সরবরাহ করেছে রুবেলের প্রতিষ্ঠান। এর ফলে শুধু এই একটি পণ্যেই বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, ম্যাগনেসিয়াম ক্রয়ের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে ফার্মাকোপিয়ার বিষয়টিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বের ওষুধ শিল্পে ইউনাইটেড স্টেটস ফার্মাকোপিয়া (USP), ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়া (BP) এবং ইউরোপিয়ান ফার্মাকোপিয়া (EP) সবচেয়ে প্রচলিত মানদণ্ড। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ইউএসপি অনুসরণ করে থাকে। অতীতে ইডিসিএলও ইউএসপি ও বিপি—উভয় মানের কাঁচামাল ব্যবহার করলেও সাম্প্রতিক সময়ে শুধুমাত্র বিপি মান গ্রহণ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, রুবেলের সরবরাহকৃত পণ্য বিপি মানের হওয়ায় এই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে ইউএসপি মানসম্পন্ন জাপানি প্রতিষ্ঠানের কমদামের প্রস্তাবও বাতিল করা হয়েছে।

একইভাবে এমোনিয়া হাইড্রোক্সাইড, সোডিয়াম ক্লোরাইড, ডক্সিসাইক্লিন এবং ১০ মিলিলিটার অ্যাম্পুল ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক মূল্য পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২২০ থেকে ২৩০ টন এমোনিয়া হাইড্রোক্সাইডের প্রয়োজন হলেও বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ডলার থাকা সত্ত্বেও তা প্রতি টন ৩ হাজার ৩২০ ডলারে কেনা হয়েছে। সোডিয়াম ক্লোরাইডের বাজারমূল্য প্রতি টন ১৬০ থেকে ১৭০ ডলার হলেও ক্রয় করা হয়েছে প্রায় ৫৭০ ডলারে। ডক্সিসাইক্লিনের বাজারমূল্য প্রতি কেজি প্রায় ৪৩ ডলার হলেও কেনা হয়েছে ৬৮ থেকে ৭৯ ডলারে। বছরে প্রায় ৬ হাজার কেজি এই কাঁচামাল ক্রয় করা হয়। অন্যদিকে ১০ মিলিলিটার অ্যাম্পুলের বাজারমূল্য প্রতি হাজারে প্রায় ৯০ ডলার হলেও তা ২২৫ ডলারে কেনা হয়েছে। বছরে প্রায় ২০ লাখ অ্যাম্পুল কেনা হয়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, এসব অনিয়মে ইডিসিএলের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি জড়িত। তাদের মধ্যে পরিচালক (কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স) মোহাম্মদ ইসমাইল এবং মহাব্যবস্থাপক (উন্নয়ন) মো. নজরুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও সিন্ডিকেটকে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেভাবে প্রভাব বিস্তার করে কাঁচামাল সরবরাহের কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই ধারা অব্যাহত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি বর্তমান সময়েও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের প্রভাব অটুট রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া আ. কা. মো. আশরাফুজ্জামানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি না, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট মহলের বড় প্রশ্ন।

তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

এদিকে সুশাসন ও সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা সীমিত করা, অযৌক্তিক কারিগরি শর্ত আরোপ এবং বাজারমূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে পণ্য ক্রয়—এসব অভিযোগ সত্য হলে তা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি সরকারি ক্রয় নীতিমালারও গুরুতর লঙ্ঘন। তাই বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।