ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১১:২২:১৯ PM

ঢেউটিনে অতিমূল্য নির্ধারণ ও ভ্যাট ফাঁকি

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.কম
08-07-2026 08:26:50 PM
ঢেউটিনে অতিমূল্য নির্ধারণ ও ভ্যাট ফাঁকি

সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীন ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের জন্য ঢেউটিন ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) লঙ্ঘন করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান না করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিএমটিএফ)-কে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তবে চুক্তিতে নিজেদের উৎপাদিত ঢেউটিন সরবরাহের অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে বিএমটিএফ নিজস্ব উৎপাদনের পরিবর্তে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টিকে গ্রুপের উৎপাদিত ঢেউটিন সংগ্রহ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে সরবরাহ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন পিপিআরের বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে, অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না হওয়ায় বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি দামে ঢেউটিন কেনা হয়েছে। একই সঙ্গে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য হিসেবে দেখিয়ে সরকারকে প্রাপ্য ভ্যাটের একটি বড় অংশ পরিশোধ না করার অভিযোগও উঠেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেটে ঢেউটিন ক্রয়ের জন্য ৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এ বরাদ্দের মধ্যে সর্বশেষ পাঁচটি পৃথক প্যাকেজের আওতায় মোট ৩৪ কোটি ৯ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকার ঢেউটিন কেনা হয়েছে।

পিপিআর অনুযায়ী, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সেই পণ্য কেনা যায়। এই বিধানের আওতায় বিএমটিএফ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করে এবং অঙ্গীকার করে যে তারা নিজেদের উৎপাদিত ঢেউটিন সরবরাহ করবে। ওই অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠানটিকে সরাসরি কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ না করে বিএমটিএফ টিকে গ্রুপের উৎপাদিত ঢেউটিন সংগ্রহ করে সরবরাহ করেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজধানীর তেজগাঁও সিএসডি কেন্দ্রীয় ত্রাণ গুদামে সরেজমিন পরিদর্শনে সরবরাহকৃত প্রতিটি ঢেউটিনের গায়ে ‘টিকে’ কোম্পানির সিল দেখা গেছে। এর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে এসব ঢেউটিন বিএমটিএফের নিজস্ব উৎপাদিত নয়।

এ ধরনের সরবরাহ পদ্ধতি সরকারি ক্রয়বিধির উদ্দেশ্য ও শর্তের পরিপন্থী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, যদি বিএমটিএফ নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম না হয়ে থাকে, তাহলে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সরবরাহকারী নির্বাচন করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে সরাসরি ক্রয়ের সুযোগ গ্রহণ করায় অন্যান্য যোগ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢেউটিনের মূল্যও বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ক্রয়াদেশে প্রতি মেট্রিক টন ঢেউটিনের মূল্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে সর্বোচ্চ মানের ঢেউটিনের দাম প্রতি মেট্রিক টন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। ত্রাণ কার্যক্রমে সাধারণত তুলনামূলক কম মানের ঢেউটিন ব্যবহার করা হয়। সে হিসেবে সরকারি ক্রয়ে নির্ধারিত মূল্য আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শনেও সরবরাহকৃত ঢেউটিনের মান নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এছাড়া ভ্যাট পরিশোধের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজেদের উৎপাদিত পণ্য সরবরাহের দাবি করে বিএমটিএফ প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে মাত্র ৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করেছে। ফলে প্রায় ১০ শতাংশ ভ্যাট কম পরিশোধের মাধ্যমে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিএমটিএফের এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল অনৈতিকই নয়, বরং এটি সরকারি অর্থ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়মের শামিল। তাদের দাবি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। বরং জেনে-শুনেই চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের মাধ্যমে সরবরাহ গ্রহণ করা হয়েছে, যা পুরো ক্রয় প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর এবং বিএমটিএফের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তাদের মতামত জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

এদিকে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, অতিমূল্যে ক্রয়, ভ্যাট ফাঁকি এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির যথাযথ ব্যবহার এবং সরকারি চুক্তির শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তারা।