ঢাকা, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১২:১৮:২০ AM

কুয়াকাটায় ১০ বছরেও প্লট বুঝে পাননি গ্রাহকরা

স্টাফ রিপোটার।।ঢাকাপ্রেস২৪.গেম
30-06-2026 12:05:53 PM
কুয়াকাটায় ১০ বছরেও প্লট বুঝে পাননি গ্রাহকরা

পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পর্যটন সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে প্লট ও হোটেলের মালিকানার স্বপ্ন দেখিয়ে বিপুল অর্থ সংগ্রহের পরও নির্ধারিত সময়ের এক দশক পেরিয়ে গ্রাহকদের প্লট বুঝিয়ে না দেওয়া, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দলিলে ভিন্ন মৌজার জমি অন্তর্ভুক্ত করা এবং বারবার নতুন অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে সেঞ্চুরি গ্রুপের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক এমজিআর নাসির মজুমদারের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী গ্রাহক।

অভিযোগ অনুযায়ী, সেঞ্চুরি গ্রুপের তিনটি বড় প্রকল্প—‘সেঞ্চুরি কুয়াকাটা মডেল টাউন’, ‘সেঞ্চুরি গোল্ড কোস্ট হোটেল অ্যান্ড স্পা’ এবং ‘সেঞ্চুরি ট্রেজার আইল্যান্ড অ্যান্ড বাটার ফ্লাই পার্ক’—নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তবে কেবল গোল্ড কোস্ট হোটেলের আংশিক নির্মাণকাজ এগিয়েছে। বাকি দুটি প্রকল্প এখনও মূলত পরিকল্পনা ও প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘সেঞ্চুরি কুয়াকাটা মডেল টাউন’ প্রকল্পে কাঠাপ্রতি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৫০ টাকা দরে পাঁচ কাঠার একটি প্লট বুকিং দেওয়া হয়। পরে ২০১১ সালের মে মাসে কোম্পানি চুক্তিপত্র হস্তান্তর করে। চুক্তি অনুযায়ী, মাসিক ১১ হাজার ২৫ টাকা করে ৭২টি কিস্তিতে ২০১৬ সালের জুন মাসে মোট ৭ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ টাকা পরিশোধ করেন গ্রাহকরা।

তবে পুরো মূল্য পরিশোধের পরও নির্ধারিত প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন গ্রাহকরা। তাদের দাবি, কিস্তি পরিশোধে সামান্য বিলম্ব হলেও বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হতো। এমনকি জরিমানা কমানোর আশ্বাস দিয়ে কোম্পানির কর্মকর্তাদের ঘুষ নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এক ভুক্তভোগী জানান, একটি কিস্তি পরিশোধে দেরি হওয়ায় কাগজপত্র ঠিক রাখতে তিনি কোম্পানির এক কর্মকর্তাকে ২০ হাজার টাকা দেন। এরপরও তার কাছ থেকে ৩১ হাজার ১৬৩ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

২০১৬ সালে প্লটের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধের পরও গ্রাহকদের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। ২০২১ সালে উন্নয়ন (ডেভেলপমেন্ট) চার্জের নামে প্লটের মূল্যের ১৫ শতাংশ হিসেবে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭০ টাকা করে আদায় করা হয়। পরে ২০২৪ সালে, অর্থাৎ পুরো অর্থ পরিশোধের প্রায় আট বছর পর জমির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হলেও নিবন্ধন ফি বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার ৯১২ টাকা নেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের প্লট নিবন্ধনের জন্য যেখানে আনুমানিক ৩৭ হাজার ৮৭৫ টাকা সরকারি ফি হওয়ার কথা, সেখানে কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায় করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

রেজিস্ট্রেশনের পর আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। দলিলে যে প্লটের উল্লেখ রয়েছে, বাস্তবে সেই প্লট দেখাতে পারেনি সেঞ্চুরি গ্রুপ। একাধিক গ্রাহক দাবি করেন, চুক্তিপত্রে নির্দিষ্ট মৌজা ও প্লট নম্বর উল্লেখ থাকলেও পরে দলিলে ভিন্ন মৌজার জমি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং আজও তাদের নির্দিষ্ট প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।

একজন ভুক্তভোগী জানান, ২০১০ সালে অবসরজীবনের সঞ্চয় দিয়ে তিনজন মিলে ১৫ কাঠা জমি বুকিং দেন। ২০১৬ সালে পুরো অর্থ পরিশোধ করলেও ২০২৬ সাল পর্যন্ত তারা জমির দখল পাননি। বরং এখনো বিভিন্ন অজুহাতে নতুন করে অর্থ দাবি করা হচ্ছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, বর্তমানে জমির নামজারির জন্য ৬০ হাজার টাকা এবং সীমানা প্রাচীর নির্মাণের নামে আরও দেড় লাখ টাকা দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ কাঠা জমির নামজারিতে সরকারি ব্যয় মাত্র ১ হাজার ১৩০ টাকা।

সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো অবকাঠামো, রাস্তা কিংবা আধুনিক নাগরিক সুবিধার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের বড় অংশ এখনও কৃষিজমি হিসেবেই রয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে ‘সেঞ্চুরি গোল্ড কোস্ট হোটেল অ্যান্ড স্পা’ প্রকল্পেও বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ রয়েছে। শুরুতে ৫০ শতাংশ জমির ওপর ১৬ তলা হোটেল নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হলেও বর্তমানে ১৪ তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ হয়েছে এবং ভবনটি আর সম্প্রসারণ করা হবে না বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া ৫০ শতাংশ জমির পরিবর্তে বাস্তবে প্রায় ১৭ শতাংশ জমিতে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পের শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে মূল্য পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার টাকা, যা পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০২৬ সালের শুরুতে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরে তা কমিয়ে ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা করা হয়।

বিনিয়োগকারীরা জানান, প্রচারপত্রে ২০২১ এবং পরে ২০২২ সালের মধ্যে প্রকল্প হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়েও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। এখনো অনেক বিনিয়োগকারী সাব-কবলা রেজিস্ট্রেশন বা মালিকানার দলিল পাননি।

আরেকটি প্রকল্প ‘সেঞ্চুরি ট্রেজার আইল্যান্ড অ্যান্ড বাটার ফ্লাই পার্ক’-এর ক্ষেত্রেও ৮১ শতাংশ জমিতে হোটেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেয়ার বিক্রি করা হলেও প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন প্রকল্পে একই জমির অংশের শেয়ার বিক্রির অভিযোগও তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা।

এ বিষয়ে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মো. সবুজ হোসাইন বলেন, নির্দিষ্ট চৌহদ্দি বা জমি চিহ্নিত না করে ক্ষুদ্র পরিমাণ জমির শেয়ার বিক্রি আইনসম্মত নয় এবং এটি প্রতারণার শামিল। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে না। জনসাধারণের কাছে শেয়ার বিক্রি করতে হলে প্রতিষ্ঠানকে আইন অনুযায়ী পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হতে হয়।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সেঞ্চুরি গ্রুপের ডিজিএম তৌফিক চৌধুরী। তিনি বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমজিআর নাসির মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোনে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তিনি লেখেন, “আপনি যা বলছেন বা ভাবছেন, আমি বা আমরা সে রকম খারাপ মানুষ নই। আমি অসুস্থ। দোয়া করবেন, মৃত্যুর আগে যেন মানুষের পাওনা বুঝিয়ে দিতে পারি।”

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ পরিশোধের পরও প্লট বা প্রকল্পের মালিকানা বুঝে না পাওয়া, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।