ঢাকা, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৫৩:৪০ PM

দলীয় রাজনীতির এক অবিচল মুখ রিজভী

মান্নান মারুফ
28-06-2026 11:25:38 AM
দলীয় রাজনীতির এক অবিচল মুখ রিজভী

ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কিছু নেতা রয়েছেন, যাদের পরিচয় কেবল পদ-পদবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দলের প্রতি অবিচল নিষ্ঠাই তাদের পরিচয়ের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তেমনই একজন নেতা, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে কাজ করে আসছেন।

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস ও নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও রুহুল কবির রিজভীর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এখনও প্রতিদিনের মতো তিনি সকালেই রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হন। দলের কর্মসূচি, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়, গণমাধ্যমে দলের অবস্থান তুলে ধরা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকি—সবকিছুতেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

দলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, বিএনপির জন্য কাজ করা রিজভীর কাছে শুধুই রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি যেন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশের চেয়ে দলীয় কর্মকাণ্ডেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা প্রতিকূলতা, মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং চাপের মধ্যেও তিনি কখনও সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির ওপর রাজনৈতিক চাপ, দলীয় কার্যালয়ে নজরদারি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার সময়েও রুহুল কবির রিজভী ছিলেন দলের অন্যতম সক্রিয় মুখপাত্র। প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলের অবস্থান তুলে ধরা, সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা এবং বিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর মতে, কঠিন সময়ে দলীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম সচল রাখতে রিজভীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দলীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই বলেন, সুখ-দুঃখের দীর্ঘ পথচলায় রুহুল কবির রিজভী তাদের অভিভাবকের মতো পাশে থেকেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অফিস পরিচালনা, কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা জানান, কখনও ব্যক্তিগত বিরক্তি বা ক্লান্তি প্রকাশ না করে তিনি নিজেই অধিকাংশ চাপ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

রিজভীর রাজনৈতিক জীবনও সংগ্রামমুখর। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। জানা যায়, সেই সময় তার শরীরে বিদ্ধ হওয়া গুলির একটি অংশ এখনও রয়ে গেছে। এর ফলে মাঝেমধ্যে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেও রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার গতি থেমে থাকেনি। অসুস্থতা উপেক্ষা করেই বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়।

রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। বর্তমানে তিনি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে নয়াপল্টনে অবস্থিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দফতর সম্পাদক এবং দলের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাকে বিএনপির জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে, যা দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে তার প্রতি নেতৃত্বের আস্থারই প্রতিফলন।

রুহুল কবির রিজভীর জন্ম ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে হলেও তার পৈত্রিক নিবাস কুড়িগ্রাম জেলায়। শৈশবে তিনি বগুড়া জিলা স্কুল, কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং বগুড়া বাংলা স্কুলে পড়াশোনা করেন। উচ্চমাধ্যমিকের পর রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে অধ্যয়ন করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা এবং ইতিহাস—দুই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি আইন বিষয়েও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে। প্রথমদিকে তিনি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনটির রাজশাহী সরকারি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি ছাত্রদলে যোগ দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক থেকে শুরু করে সাধারণ সম্পাদক এবং পরে কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়ে ছাত্র নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।

পরবর্তী সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর থেকে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম, রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ এবং গণমাধ্যমে দলের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় রুহুল কবির রিজভী এমন একজন নেতা, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম এবং গণমাধ্যমে দলীয় অবস্থান উপস্থাপনের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় তৈরি করেছেন। বিশেষ করে সংকটময় সময়ে দলের মুখপাত্র হিসেবে তার নিয়মিত বক্তব্য বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরতে সহায়ক হয়েছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রচারের চেয়ে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে রুহুল কবির রিজভীর আগ্রহ বেশি। দীর্ঘ সংগ্রাম, নানা প্রতিকূলতা এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও তিনি যে ধারাবাহিকভাবে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন, সেটিই তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

সব মিলিয়ে, রুহুল কবির রিজভী বিএনপির এমন একজন সংগঠক, যিনি দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক দায়িত্ব এবং দলীয় আদর্শের প্রতি নিষ্ঠার মাধ্যমে নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেছেন। তার সমর্থকদের মতে, দলীয় কার্যালয়, নেতাকর্মী এবং বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম আজ তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আর সেই কারণেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক হিসেবে পরিচিত।